তৃণমূলের ভোটব্যাংক থেকে ভাগ হয়ে গেছে মুসলিম ভোট। আর একেই জয়ের বড় কারণ হিসেবে মনে করছেন বিজেপি নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ধর্মের ভিত্তিতে ভোটের এই মেরূকরণই বিজেপির সাফল্যের কারণ বলে মনে করছেন এই নেতা।
তার ভাষ্য, ‘মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গেছে। তৃণমূল পায়নি। আর হিন্দু ভোট আমরা একত্র করতে পেরেছি।’
শুভেন্দুর এমন বক্তব্য এলো ঠিক তখন, যখন জয় মোটামুটি সুনিশ্চিত বিজেপির।
২০২৬ সালের ৪ মে দিনটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সোমবার (৪ মে) ভোট গণনার প্রাথমিক ফল যদি ঠিক থাকে, তাহলে দেড় দশকের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি এগিয়ে চলেছে এক ঐতিহাসিক জয়ের পথে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ১৮১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যেখানে তৃণমূল থমকে আছে মাত্র ৯২টি আসনে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিজেপি এককভাবে ৪৬ শতাংশের বেশি ভোট পেতে চলেছে, যা গতবারের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় হিন্দু ভোট প্রায় একতরফাভাবে বিজেপির দিকে গেছে। সন্দেশখালির মতো স্পর্শকাতর ইস্যু এবং সিএএ কার্যকর হওয়ার প্রভাব হিন্দু ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তার প্রশ্নে বিজেপিকে একমাত্র বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এ ছাড়া বামপন্থী ভোটারদের একটি বড় অংশ— যারা নিজেদের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বা তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মরিয়া ছিল— তারা সরাসরি বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। এই 'নিভৃত মেরূকরণ' তৃণমূলের দক্ষিণবঙ্গের কেল্লাগুলোকেও ধসিয়ে দিয়েছে।
তৃণমূলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল সংখ্যালঘু ভোট, কিন্তু এবার সেখানে বড়সড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ওবিসি সংরক্ষণ ইস্যুতে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের পর রাজ্য সরকারের আইনি পদক্ষেপে দীর্ঘসূত্রতা এবং মুসলিম ওবিসি সার্টিফিকেট বাতিলের ফলে লাখো মুসলিম যুবক কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
এর পাশাপাশি ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনা নিয়ে নানা অভিযোগগুলোও অমূলক নয়। বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ জমি জবরদখল হয়ে থাকা এবং তার সঠিক ব্যবহার না হওয়া নিয়ে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল দীর্ঘদিনের। উপরন্তু, নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আইএসএফ এবং বাম-কংগ্রেস জোট মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোয় মুসলিম ভোটের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কেটে নিয়েছে। এই ভোট বিভাজন সরাসরি বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে, আর পিছিয়ে দিয়েছে তৃণমূলকে। সে কারণেই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও বিজেপি এবার অভাবনীয় ফলাফল পেয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো তৃণমূল সরকারের দমনমূলক নীতি। গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে যারা সরব হয়েছেন বা পৃথক রাজনৈতিক সত্তা তৈরির চেষ্টা করেছেন, তাদের অনেকের ওপর পুলিশি ব্যবস্থা এবং ধরপাকড় করা হয়েছে। এই বিষয়টি মুসলিম ভোটারদের একাংশকে এই বার্তা দিয়েছে যে, সরকার তাদের শুধু ভোটব্যাংক হিসেবে দেখতে চায়, অংশীদার হিসেবে নয়। ফলে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এবার ব্যালট বাক্সে তারা বিকল্প খুঁজছেন।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং নির্ণায়ক বিষয় হলো ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর)-এর মাধ্যমে রাজ্য জুড়ে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম কাটা গেছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
তৃণমূলের অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনা (১২ দশমিক ৬ লাখ), দক্ষিণ ২৪ পরগনা (১০ দশমিক ৯১ লাখ) এবং মুর্শিদাবাদের (৭ দশমিক ৪৮ লাখ) মতো সংখ্যালঘু ও দরিদ্র অধ্যুষিত জেলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গেছে। অনেক আসনেই দেখা যাচ্ছে যে, পরাজয়ের ব্যবধান বাদ পড়া ভোটার সংখ্যার চেয়েও কম। ফলে এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই তৃণমূলের ভোট অংককে তছনছ করে দিয়েছে।
টানা ১৫ বছরের শাসনকালে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবার তুঙ্গে ছিল। শিক্ষা নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন বণ্টন কেলেঙ্কারি—তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের জেলযাত্রা সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। রেকর্ড ৯২ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোটদানই প্রমাণ করে যে, মানুষ পরিবর্তনের লক্ষ্যে বুথমুখী হয়েছিলেন।
বাম-কংগ্রেস জোটও তাদের ভোট শেয়ার কিছুটা বাড়িয়ে ১০-১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়ায় অনেক ত্রিমুখী লড়াইয়ে তৃণমূলের পরাজয় ত্বরান্বিত হয়েছে। হিন্দু ভোটের সংহতি এবং মুসলিম ভোটের ভাঙন— এই দুইয়ের চাপে পড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় ভাবমূর্তি আজ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।