২০২৬ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ এক নতুন মোড় নিয়েছে। তথ্য এবং বর্তমান নির্বাচনী ট্রেন্ড অনুযায়ী, বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কদের সংখ্যার যে ‘অদৃশ্য সিলিং’ বা সর্বোচ্চ সীমার কথা বলা হয়েছিল, তা প্রতিফলিত হচ্ছে বাস্তবে। তৃণমূল কংগ্রেস তার ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থীর মধ্যে অধিকাংশকেই জয়ী করতে পারলেও, সামগ্রিক বিধায়ক সংখ্যা ভাঙতে পারছে না অতীতের রেকর্ড।
বিশেষ করে মেটিয়াব্রুজ কেন্দ্রে ৮৭ হাজার ৮৭৯ ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে নজির গড়েছেন তৃণমূলের আবদুল খালেক মোল্লা। অন্যদিকে, কলকাতার হেভিওয়েট প্রার্থী ফিরহাদ হাকিম বন্দর কেন্দ্র থেকে ৫৬ হাজার ৪৯০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে ধরে রেখেছেন নিজের গড়। কসবা কেন্দ্রে বিদায়ী বিধায়ক জাভেদ আহমেদ খান ২০ হাজার ৯৭৪ ভোটে জয়ী হয়েছেন, যদিও ২০২১ সালে জয়ের ব্যবধান ছিল ৬৩,৬২২ ভোট। অর্থাৎ জয়ের মার্জিন এবার অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে তার।
মুর্শিদাবাদ জেলা বরাবরই প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে মুসলিম বিধায়কদের। এবারও এখান থেকে তৃণমূলের বাবর আলি জলঙ্গী আসনে এবং হরিহরপাড়া আসনে জয়লাভ করেছেন নিয়ামত শেখ। শামশেরগঞ্জ আসনে তৃণমূলের মুহাম্মদ নূর আলম এবং ভরতপুর থেকে মুস্তাফিজুর রহমানও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন নিজেদের আসন। ভগবানগোলা আসনে তৃণমূলের রেয়াত হোসেন সরকার জয়ী হয়েছেন ৫৬ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে। মালদা জেলার সুজাপুর থেকে তৃণমূলের সাবিনা ইয়াসমিন ৬০ হাজার ২৮৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জিতে আধিপত্যের প্রমাণ করেছেন। এছাড়া মথাবাড়ি আসনে জয়ের পথে এগিয়ে রয়েছেন তৃণমূলের নজরুল ইসলাম। বীরভূমের হাসন কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন তৃণমূলের কাজল শেখ এবং উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গা কেন্দ্রে জয় পেয়েছেন আনিসুর রহমান বিদেশ।
বিরোধী শিবিরের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভাঙ্গড় আসনে জয়ী হয়ে সংখ্যালঘু রাজনীতির একটি পৃথক ধারা বজায় রেখেছেন আইএসএফ প্রার্থী নওসাদ সিদ্দিকী। মুর্শিদাবাদের ডোমকল আসনে সিপিএমের টিকিটে জয়ী হয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান রানা, যা বামেদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি। এছাড়া আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেউপি) হয়ে হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও নওদা—এই দুটি কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন। কংগ্রেসের টিকিটে এবারও দু-একজন মুসলিম প্রার্থী লড়াইয়ে থাকলেও সার্বিক সংখ্যায় বেশ পিছিয়ে তারা।
এই নির্বাচনের সবথেকে বড় পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন হলো মুসলিম বিধায়কদের সামগ্রিক সংখ্যা। ২০০৬ সালে যেখানে ৪৬ জন এবং ২০১১ সালে ৫৯ জন মুসলিম বিধায়ক ছিলেন, ২০২৬-এর শেষে এই সংখ্যাটি সীমাবদ্ধ থাকছে ৪০-৪২ এর ঘরেই। বিজেপি তাদের প্রার্থী তালিকায় কোনো মুসলিম প্রতিনিধি না রাখায় এবং তারা বিপুল সংখ্যক আসনে (প্রায় ১৮১-২০৪টি আসনে এগিয়ে বা জয়ী) শক্তিশালী অবস্থায় থাকায়, রাজ্যের একটি বড় অংশের বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব পুরোপুরি শূন্য হয়ে গেছে। শাসক দল তৃণমূল তাদের প্রার্থী সংখ্যা কমিয়ে ৪৭ (১৬.১৫%) করায় মুসলিম প্রার্থীদের জয়ের সর্বোচ্চ সীমা শুরুতেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। ফলে জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের এই নিম্নমুখী প্রবণতা নির্বাচনী রাজনীতিতে এক গভীর জনতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে।
২০২৬-এর এই নির্বাচনে মুসলিম ভোটব্যাংকের সংহতি থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে বিধানসভার অন্দরে এই সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে কিছুটা স্তিমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জয়ের ব্যবধান বড় হলেও সামগ্রিক সংখ্যাতত্ত্বে ফুটে উঠছে এক ধরনের সংকোচন।