Image description

প্রত্যাবর্তন নাকি পরিবর্তন? মোদি না দিদি? গত চার দিনের এ গোলকধাঁধা ভেঙে এখন জয়োল্লাসের ঢেউ পশ্চিমবঙ্গে। বিজয় ঘোষণার আগেই বিজেপির পদ্ম ঝড়ে উড়ছে তৃণমূলের ঘাসফুল। মধ্যগগন থেকে ঢলে পড়ছে মমতার সূর্য। দশ দিক থেকে ধেয়ে আসছে পরাজয়ের কালো মেঘ।

ঠিক এর উল্টো চিত্রই বিজেপির উঠোনে। টানা ১৫ বছর পর দরজায় কড়া নাড়ছে নতুন দিনের সকাল। বিজেপির দখলেই যাচ্ছে মমতার গদি— শেষবেলা পর্যন্ত পাওয়া আলামতে সে পথেই হাঁটছে ভোটকেন্দ্রগুলোর ফল। বিজেপি ২০৫। তৃণমূল ৮২। সবেধন এক আসন পেয়ে শেষ পর্যন্ত মুখরক্ষা হয়েছে সিপিএমের। দুই আসনে গা ভাসিয়ে কোনোরকমে ভরাডুবি বাঁচিয়েছে কংগ্রেসও। কিন্তু শোরগোল এখন— মুখ্যমন্ত্রী হবেন কে? অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কি টিকে থাকতে পারবেন রাজ্য বিজেপির মুখ শুভেন্দু অধিকারী? বেলা ডুবতেই চাঙ্গা হয়ে উঠছে বাংলার এই নতুন ঘরের আঁধার।

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার উত্তেজনার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তীব্র হচ্ছে নতুন সমীকরণ। সেটি হলো মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রামে হেরে গিয়েও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার সেই নন্দীগ্রামে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন শুভেন্দু অধিকারী।

সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারী এগিয়ে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে পুরনো নজির টেনে নতুন প্রশ্ন তুলছে রাজনৈতিক মহল— মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য কি নিজের আসনে জেতা জরুরি?

ফিরে দেখা যাক ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। সেই সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন। রাজনৈতিকভাবে সেটি ছিল একটি বড় ধাক্কা। যদিও তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর কারণ রয়েছে সংবিধানে। ভারতের সংবিধানের ১৬৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিধায়ক না হলেও মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। তবে তার শর্ত একটাই— ছয় মাসের মধ্যে বিধানসভার সদস্য হতে হবে। না হলে পদ ছাড়তে হবে। অর্থাৎ, সরাসরি নির্বাচনে জেতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার একমাত্র পথ নয়। এই সাংবিধানিক বিধান কাজে লাগিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শপথ নেওয়ার পর ভবানীপুর উপনির্বাচনে জিতে বিধায়ক হন এবং নিজের অবস্থান পাকা করেন। উল্লেখ্য যে, এর আগেও ২০১১ সালে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সময় তিনি বিধায়ক ছিলেন না, পরে বিধানসভায় নির্বাচিত হন।

আর এই নজির থেকেই এবার নতুন করে জল্পনা— যদি বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং শুভেন্দু অধিকারী নিজের আসনে হেরে যান, তাহলেও তিনি মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। তবে তাকেও ছয় মাসের মধ্যে কোনো আসন থেকে জিতে আসতে হবে।

তবে এবারের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী একাধিক আসন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর থেকে লড়ছেন। বিশেষ করে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্ভাব্য মুখোমুখি লড়াই এ নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। তবে বাস্তব রাজনীতির অঙ্ক এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে তার দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু শুভেন্দুর ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা নির্ভর করছে পুরোপুরি নির্বাচনের ফল, দলীয় সমর্থন এবং জোটের সমীকরণের ওপর।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান সুযোগ দেয় ঠিকই, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নেয় রাজনৈতিক বাস্তবতা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনমত— সব মিলিয়েই ঠিক হয় কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন। আর এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রাম আবারও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। একসময় যেখানে হেরে গিয়েও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার সেই নন্দীগ্রাম জিতে কি মুখ্যমন্ত্রী হতে পারবেন শুভেন্দু অধিকারী? ভোট গণনার ফল যত এগোবে, এই প্রশ্নের উত্তরও তত পরিষ্কার হবে।