যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে অতীতে তার পরিবারের পক্ষ থেকেই একাধিকবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল। তার অস্বাভাবিক ও সহিংস আচরণের কারণে তাকে নিয়ে পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগে ছিল বলে জানা গেছে।
হিশামের ছোট ভাই ২২ বছর বয়সী আহমদ আবুঘরবেহ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তাঁর বড় ভাই খুব দ্রুত রেগে যান। তাঁর ভাইয়ের পক্ষে অন্য কারও সঙ্গে এক কক্ষে বসবাস করা সম্ভব হওয়ার কথা নয় বলেই তিনি মনে করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাঁর যে একজন রুমমেট ছিলেন, এটা আমি জানতাম না। তাঁর নিজের মতো করে একা থাকার কথা অথবা গৃহহীন থাকার কথা।’
আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকালে হঠাৎ করেই হিশাম পরিবারের বাড়িতে উপস্থিত হন। তখন পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠলে পরিবারের সদস্যরাই পুলিশকে খবর দেন। আহমদ বলেন, ‘তিনি খুবই অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। তাই তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে আমি পুলিশ ডেকেছিলাম।’
আদালতের নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকেই হিশাম পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং তখনই তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার বাড়ির আশপাশে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পরিবার আদালতে আবেদনও করেছিল।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতে অতীতে একাধিকবার হিশাম আবুঘরবেহকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পুলিশের নথি অনুযায়ী, এক ঘটনায় তার ছোট বোন অভিযোগ করেন যে, ‘একদিন হিশাম তাঁদের বাড়ির বসার ঘরে শুধু একটি তোয়ালে পরে ভিডিও গেম খেলছিলেন। তা দেখে তাঁর ছোট বোন আপত্তি তোলেন। তখন হিশাম বোনের দিকে তেড়ে যান এবং বোনকে জোর করে চুমু দেওয়ার চেষ্টা করেন। বোন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে কোনোভাবে সেখান থেকে সরে যান।’
এছাড়া আরও অভিযোগ রয়েছে যে, পারিবারিক কলহে হিশাম একাধিকবার সহিংস আচরণ করেছেন এবং পরিবারের সদস্যদের মারধরও করেছেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি অতীতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।
আহমদ আবুঘরবেহ বলেন, ‘আমি কিছুতেই তাঁদের কথা ভুলে থাকতে পারছি না... আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগছে। আমি সত্যিই দুঃখিত। সবকিছুর জন্য আমি খুবই অনুতপ্ত। আমি খুবই লজ্জিত এবং অপরাধবোধে ভুগছি। একইভাবে আমার পুরো পরিবার লজ্জিত এবং অপরাধবোধে ভুগছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা অতীতে তাঁকে নিয়ে পুলিশকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম।’
আদালতের নথি অনুযায়ী, পরিবার হিশামের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে একটি প্রটেকটিভ অর্ডার পায়, তবে ২০২৫ সালে করা আরেকটি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। বিচারক সেই আবেদন খারিজ করেন কারণ সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগ আর এগিয়ে নেওয়া হয়নি।
আহমদ জানান, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ভাইয়ের বিরুদ্ধে করা মামলা চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছিলাম। কারণ, আমার মনে হয়েছিল এতে অনেক টাকা খরচ হবে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই আমি ভেতরে ভেতরে খুব অনুতপ্ত ছিলাম।’
২০২৩ সালের একটি অভিযোগপত্রে আহমদ উল্লেখ করেন, ‘… বারবার আমার মাথায় ঘুষি মেরেছেন, আমার শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছেন এবং আমাকে রক্তাক্ত করেছেন। পাশাপাশি আমার মুখে আঘাত করেছেন, মুখে কালশিটে পড়ে গেছে। সে সময় পুলিশ ডাকতে আমি বাড়ির বাইরে গেলে তিনি আমাদের পারিবারিক মিনিভ্যান নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেটি নষ্ট থাকায় তিনি আবার ফিরে আসেন।’
আরেকটি ঘটনায় তিনি অভিযোগ করেন, পারিবারিক একটি ছোট বিষয় নিয়ে মায়ের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার পর হিশাম পুরো বসার ঘর তছনছ করে ফেলেন।
এদিকে শুক্রবার হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তারের সময়ের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি কোমরে একটি নীল তোয়ালে জড়িয়ে দুই হাত ওপরে তুলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছেন।
ঘটনায় নিহত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন আহমদ আবুঘরবেহ। তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি খুবই অনুতপ্ত এবং লজ্জিত।’
সূত্র: সিবিএস নিউজ