প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে একতরফা বিজয় ঘোষণা করলে ইরান কী করতে পারে, তা বিশ্লেষণ করছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে হাজারো মানুষের মৃত্যু হোয়াইট হাউসের ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশে গোয়েন্দা বাহিনী সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করছে। তারা জানার চেষ্টা করছেন– ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে সরে আসলে তার রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব কী হতে পারে। একইসঙ্গে এই সিদ্ধান্ত আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য সম্ভাব্য কী কী ক্ষতি বয়ে আনবে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনে ট্রাম্প আবার সামরিক অভিযান জোরদার করতে পারেন। উত্তেজনা কমলে রাজনৈতিক চাপ হ্রাস পাবে। তবে এতে ইরান আরও আত্মবিশ্বাসী এবং শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হবে। তেহরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করতে পারে বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের। সেটি হলে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সূত্র নাম গোপনের শর্তে কথা বলেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এই বিশ্লেষণ কবে শেষ হবে, তা স্পষ্ট করেনি তারা। তবে আগেও গোয়েন্দারা একই ধরনের পরিস্থিতিতে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করেছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বোমা হামলার পর গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল, ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করে অঞ্চল থেকে সেনা কমিয়ে নিলে ইরানের কৌশলগত জয় হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বিজয় দাবি করে বড় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখলে তেহরান সেটিকে আলোচনার চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে বিবেচনা করবে। এতে যুদ্ধের সমাপ্তি অনিশ্চিত হবে।
অবশ্য সিআইএ জানিয়েছে, তাদের কাছে এই ধরনের মূল্যায়নের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের প্রধান সমন্বয়কারী সংস্থা (ওডিএনআই) কোনো মন্তব্য করেনি। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাড়াহুড়োর মাধ্যমে আমরা কোনো বাজে চুক্তি করতে চাযই না। জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার দিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না।
তীব্র রাজনৈতিক চাপ
জনমত জরিপ বলছে, ইরান যুদ্ধ আমেরিকানদের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ মনে করে, সামরিক অভিযানের খরচ সার্থক হয়েছে। আর ২৫ শতাংশের মত, যুদ্ধের কারণে দেশের নিরাপত্তা বেড়েছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প নিজে এবং তাঁর দল তীব্র রাজনৈতিক চাপে রয়েছে, যা তিনি ভালোভাবেই জানেন।
যুদ্ধবিরতির ২০ দিন পরেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ইরান জাহাজে হামলা ও মাইন স্থাপনের মাধ্যমে এই নৌপথ কার্যত বন্ধ রেখেছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রোলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি ইরানকে বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি কমায় এবং উভয়পক্ষ অবরোধ প্রত্যাহার করে। তাহলে জ্বালানির দাম কমতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এমন সমঝোতার ইঙ্গিত নেই।
সম্প্রতি ট্রাম্প তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের পাকিস্তান সফর বাতিল করেন। সেখানে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা ছিল তাদের।
সামরিক বিকল্প প্রস্তুত
পেন্টাগনের সূত্র জানিয়েছে, এখনো বিভিন্ন সামরিক বিকল্প বিবেচনায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে আবার ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা অন্যতম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বড় ধরনের পদক্ষেপ– যেমন ইরানের মূল ভূখণ্ডে স্থল অভিযানের আর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা অভ্যন্তরীণ চাপ খুবই বেশি বলে জানিয়েছেন।
একটি সূত্র জানায়, যুদ্ধবিরতির সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ড্রোনসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম মেরামত কিংবা উৎপাদন বাড়াচ্ছে ইরান। ফলে আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত খরচ অনেক বেশি হতে পারে।