আজ ফিলিস্তিনি কারাবন্দি দিবস। প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মানবেতর জীবনের কথা বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিতে এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ পালিত হয় বিশেষ এই দিবসটি।
এ বছর যখন দিবসটি পালন করা হচ্ছে, তখন ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বন্দিদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশকেই কোনো ধরনের বিচার বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে।
এই দিবসের প্রেক্ষাপট পাঁচ দশক আগের একটি ঘটনা। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে প্রথম বন্দি বিনিময়ের আওতায় মুক্তি পেয়েছিলেন মাহমুদ বকর হেজাজি নামে এক ফিলিস্তিনি। ঐতিহাসিক সেই দিনটিকে সম্মান জানিয়ে ১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল কাউন্সিল ১৭ এপ্রিলকে জাতীয় বন্দি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকেই দিনটি ফিলিস্তিনিদের জাতীয় সংগ্রাম এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা আদামেরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ৯ হাজার ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন ইসরায়েলের কারাগারে। এরমধ্যে ৩ হাজার ৫৩২ জনকে বন্দি রাখা হয়েছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন বা ‘প্রশাসনিক আটক’ নীতিতে।
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন নীতির মানে হলো, এর আওতায় আটকদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেই, এবং কোনো ধরনের বিচার ছাড়াই তাদের আটকাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো যাবে।
সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ইসরায়েলি এই মুহূর্তে বন্দিদের মধ্যে ৩৪২ জন শিশু ও অন্তত ৮৪ জন নারী।
পরিসংখ্যান বলছে, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৬৭ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। এই পরিমাণ মানুষ ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ৫ জন ফিলিস্তিনির মধ্যে একজন অন্তত একবার হলেও কারাবরণ করেছেন।
আলজাজিরার খবর জানাচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের বিচারের ক্ষেত্রে একটি দ্বিমুখী ব্যবস্থা পরিচালনা করে ইসরায়েল। পশ্চিম তীরে বসবাসরত ইসরায়েলি নাগরিকরা বেসামরিক আইনের আওতায় থাকলেও ফিলিস্তিনিদের বিচার করা হয় সামরিক আদালতে।
অনেক ক্ষেত্রে এই সামরিক আদালতে ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সাজা প্রদান করা হয়, যা মানবাধিকার কর্মীদের মতে পক্ষপাতদুষ্ট। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত অমানবিক।
ইসরায়েল বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে শিশুদের সামরিক আদালতে বিচার করা হয় এবং গ্রেপ্তারের পর তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনেরও অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
এ বছরের কারাবন্দি দিবসটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ইসরায়েলের নতুন ‘মৃত্যুদণ্ড আইন’ পাসের কারণে। গত ৩০ মার্চ অনুমোদিত এই আইনটি এপ্রিলের শেষ নাগাদ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই আইনটি অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। কারণ, এটি শুধু ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করেই প্রণয়ন করা হয়েছে।
এ আইনের আওতায় কোনো ফিলিস্তিনি ইসরায়েলিকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, কিন্তু কোনো ইহুদি ইসরায়েলি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলে একই সাজা কার্যকর হবে না।
জাতিসংঘ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপকে যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।