Image description

সময় দেওয়া হয়েছিল ৪৮ ঘণ্টা। আগুনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হবে, অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে, ইরান আরও গভীর যুদ্ধে পতিত হবে। ঠিক এমন ভাষাই ব্যবহার করা হয়েছিল, বার্তা ছিল স্পষ্ট—আমাদের কর্তৃত্ব মেনে নাও, না হলে ধ্বংস হও।

 

কিন্তু এই হুমকি হঠাৎই মিলিয়ে গেল। কোনো হামলা নয়, কোনো উত্তেজনা নয়, হুমকির বাস্তবায়নও নয়। কারণ, এবার ফাঁপা আওয়াজ ধরা পড়ে গেছে।

 

ইরান ভড়কে যায়নি, সময় চায়নি, আপসের চেষ্টা করেনি। বরং স্পষ্ট প্রতিরোধের ভাষায় জবাব দিয়েছে। কোনো আঘাত একা সহ্য করা হবে না, বরং তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। তারা বলে দিয়েছে, হামলা চলতে থাকলে জ্বালানি করিডর সুরক্ষিত থাকবে না, আগুন শুধু আর ইরানের সীমানায় থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে সবখানে।

 

এই বাস্তবতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছু হটলেন। কিন্তু তিনি যে কারণ দেখিয়ে পেছালেন, বাস্তব কারণ সেটি নয়। উত্তপ্ত উপসাগরীয় পরিস্থিতির প্রতি উদ্বেগ থেকে নয়, আঞ্চলিক অর্থনীতির নিম্নগতির কারণে নয়, এমনকি যুদ্ধ বিস্তারের নৈতিক দ্বিধা থেকেও নয়, ট্রাম্প পিছু হটলেন একটিমাত্র কারণে, আর তা হলো—বাজার।

 

শুরু থেকেই এই যুদ্ধের একটি গোপন ছন্দ ছিল—বাজার বন্ধ হলে উত্তেজনা বৃদ্ধি, আর বাজার খোলার আগে উত্তেজনা হ্রাস। সপ্তাহান্তে হুমকি, আবার দুদিন পরই সুর নরম করার বিষয়টি ইরানি পর্যবেক্ষকেরা শুরুতেই বুঝেছিলেন। তারা বলেছিলেন, এটা আসলে একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক অভিযান।

 

বড় বড় কথা আসলে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজনে বলা হয় না, বরং বলা হয়, বাজার পরিস্থিতি মাথায় রেখে। পিছু হটাও কূটনীতির কারণে নয়, বরং বাজারের অস্থিরতা বিবেচনায়। আর সত্যটি লুকিয়ে আছে এখানেই—ট্রাম্প এই যুদ্ধ মানুষের জীবন দিয়ে নয়, পরিমাপ করছেন বাজারের গ্রাফের ওঠানামা দিয়ে। তেল, বাজার আর ভাবমূর্তি—এই অক্ষরেখায়ই তার সিদ্ধান্ত আবর্তিত হয়।

 

উপসাগর জ্বললেও ট্রাম্প পিছু হটেননি, তিনি পিছু হটলেন, যখন বাজার অস্থির হলো। তার দাঁড়িপাল্লায় একটি তেলের ড্রামের ওজন একটি গোটা জনপদের চেয়ে বেশি।

 

সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালালে তার পাল্টা আঘাত তাদের দিকেই ফিরবে। সেই সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়েছে। হামলা হয়েছে, পরিণতিও এসেছে। তবুও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসেনি। কোনো পুনর্বিবেচনা নয়, কোনো সংযম নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগও নয়। কিন্তু যখন হুমকি ঘুরে নিজ দিকেই আসে, যখন বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা, তেলের দামে ধাক্কা, আর্থিক অস্থিরতা—তখনই হঠাৎ দ্বিধা দেখা দেয়। আসে বিরতি, বিলম্বের আলোচনা।

 

এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, সেখানে কোনো সমঝোতা নেই, আলোচনা নেই, নেই কোনো দাবিদাওয়া। আছে পরিস্থিতির চাপে পিষ্ট কয়েকটি দেশ, যারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া যুদ্ধকে থামানোর চেষ্টা করছে। কিছু পরোক্ষ বার্তা আছে, সংকেত আছে, প্রস্তাব আছে, সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই নেই কোনো চুক্তি।

 

ট্রাম্প অচিরেই দাবি করতে যাচ্ছেন, যে একটি চুক্তি হয়েছে। তবে সেই দাবি অবশ্যই কূটনৈতিক নয়। সেটি হতে যাচ্ছে আইওয়াশ। যেখানে পিছু হটাকে কৌশল হিসেবে দেখানো হবে, দ্বিধাকে রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। সেই মুহূর্তের তাৎপর্য আরও সরল ও গভীর। আর তা হলো—ট্রাম্প পিছু হটেছেন।

 

তবে এটিই শেষ নয়। কারণ, এই যুদ্ধের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রতারণা। সম্ভবত আমরা যা দেখছি, তা একটি কৌশলগত চাল—শান্তির জন্য নয়, সময়ক্ষেপণ করার জন্য। এই সময় নেওয়া হবে বাজার স্থিতিশীল করার জন্য, সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য, প্রতিপক্ষের মনে বিভ্রম তৈরির জন্য।

 

এটি নতুন কিছু নয়। এটি একটি চক্রাকার ধারা। বাস্তবে, এবার তৃতীয়বারের মতো ট্রাম্প এই কৌশল প্রয়োগ করছেন। প্রথমটি হয়েছিল গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের আগে। দ্বিতীয়টি সংঘাতের আগে, আলোচনার সময়। এবার সেই একই স্ক্রিপ্ট, একই চরিত্র, একই অভিনয়। শুধু মোড়কটি নতুন।

 

তবে এবার বিভ্রম কাজ করছে না। ইরানি গণমাধ্যম, সরকারি বিবৃতি, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেহারায় এই নাটক বিশ্বাসের কোনো লক্ষণ নেই। ইরান বুঝে গেছে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন মূলত অহংকার, লোভ ও প্রতারণার নোংরা ত্রয়ী দিয়ে চালিত। আর প্রবাদে আছে, ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।

 

সামরিক সংযমের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সব লক্ষণই উল্টো। কারণ, এখনও দশ হাজারেরও বেশি সেনা উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা আছে, মোতায়েন করা আছে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, অভিযাত্রী ইউনিট, যুদ্ধবিমান। এমনকি র‌্যাপিড অ্যাকশন বাহিনী এবং সতর্ক অবস্থায় থাকা প্যারাট্রুপার ইউনিটও মোতায়েন আছে।

 

যুদ্ধ থামছে না, বরং বিস্তৃত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ, উপকূলীয় অবকাঠামোয় হামলা, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র দখলের মতো পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে।

 

এদিকে ‘বিরতি’ ও ‘বিলম্বের’ মতো শব্দ ব্যবহার হলেও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে, ইসফাহান ও খোররামশাহর অঞ্চলের স্থাপনাগুলোতেও আঘাতের খবর পাওয়া গেছে। এতে স্পষ্ট, সংযমের দাবি সত্ত্বেও পরিকল্পনা এগিয়েই চলছে।

 

এটি উত্তেজনা হ্রাস নয়, এটি প্রস্তুতি। আর এর পেছনে রয়েছে এমন একটি জোট, যারা শান্তি চায় না। ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী। ওয়াশিংটনে তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা নিরবচ্ছিন্নভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর পক্ষে চাপ দিচ্ছেন। প্রভাবশালী নেটওয়ার্কগুলো এই সংঘাতকে ঝুঁকি নয় বরং সুযোগ হিসেবে দেখছে। তাদের কাছে যুদ্ধ কোনো বিপদ নয়, এটি একটি প্রকল্প।

 

ইরানও সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনের সংকেতের ওপর তাদের আস্থা নেই। আসন্ন চুক্তির বয়ান তারা গ্রহণ করছে না। আরও মজার বিষয়, তারা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার আবিষ্কার করেছে, আর সেটি হলো হরমুজ প্রণালি। ইরান বুঝেছে, হরমুজ তাদের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। আগে যেখানে আলোচনা ঘুরত পারমাণবিক সীমা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রশ্নে, এখন তা ঘুরপাক খাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে ঘিরে।

 

হরমুজ একটি কৌশলগত অস্ত্র। কেন্দ্রীয়, নির্ধারক ও অনিবার্য। বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ তেল এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে যায়। ফলে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যে কোনো সময় বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।

 

ইরান তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সব ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে তাদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না—এই নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।

 

এখানেই তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকর সত্যটি লুকিয়ে আছে। ইরানকে দুর্বল করার জন্য শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বহু ক্ষেত্রে তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। যেখানে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার কথা ছিল, সেখানে তা তাকে আরও স্থিতিস্থাপক ও অর্থনৈতিকভাবে নমনীয় করেছে। নিষেধাজ্ঞা কঠোর হয়নি, বরং শিথিল হয়েছে। তেল উৎপাদন বেড়েছে। দাম বেড়েছে।

 

যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ইরানের কাছে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রণোদনা তত কমবে। অতএব, যা দেখা যাচ্ছে, তা কোনো সমাধান নয়। এটি একটি কৌশলগত বিরতি। এক পক্ষ পুনর্বিন্যাস করছে, অন্য পক্ষ শক্তি সঞ্চয় করছে, আর সবাই পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

 

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]