Image description

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বটতলায় তখনো একটি নাটকের মহড়া চলছিল। ঘড়িতে রাত প্রায় ১০টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাজিফা তাসনিম তৃষা জানেন, রাত ১০টা বেজে পাঁচ মিনিটে হলের গেটে পৌঁছালে রেজিস্টার খাতায় সই করে ভেতরে ঢুকতে হবে। আর রাত ১১টা এক মিনিট হলেও হলের গেট পুরোপুরি বন্ধ; তখন আর কিছুতেই ভেতরে ঢোকা যাবে না।

মহড়া শেষ করে তৃষা হাঁটা শুরু করলেন, তবে নিজের হলের দিকে নয়। তিনি চললেন শহর পার হয়ে উত্তরার দিকে, পরিচিত এক মানুষের বাসায় রাত কাটাতে। রাত ১১টার পর এভাবে অন্যের বাড়ি যাওয়া এখন তার রোজকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

তৃষা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলে সান্ধ্য আইনের কারণে তাকে মাঝরাতে অন্য মানুষের বাসায় গিয়ে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু এই সান্ধ্য আইনের পেছনে আসল যুক্তিটা কী, তা তিনি এখনো বুঝতে পারেন না।

কেবল তৃষা একা নন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্রী প্রতিদিন এই একই বাস্তবতার মুখোমুখি হন। আর এই ক্ষোভ থেকেই এখন একটি সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠেছে। হলে ফেরার এই সময়সীমার প্রতিবাদে গত ৩০ জুলাই থেকে ছাত্রীরা সোচ্চার হয়েছেন।

নারী হলগুলোর গেটে দেয়াললিখনের মাধ্যমে এই প্রতিবাদের শুরু হয়। এরপর সংবাদ সম্মেলন ও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ১৪০০-এর বেশি ছাত্রী এই আন্দোলনে নিজেদের সমর্থন জানান।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি তিনটি। প্রথমত, রাত ১০টার মধ্যে হলে ফেরার নিয়ম পুরোপুরি বাতিল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিচয়পত্র দেখিয়ে ছাত্রীদের যেকোনো নারী হলে ঢোকার অনুমতি দিতে হবে। তৃতীয়ত, মা ও বোনসহ নারী আত্মীয়দের হলে ঢোকা ও থাকার সুযোগ দিতে হবে।

এসব দাবি আদায়ে গড়ে ওঠেছে ‘অবরোধবাসিনী’ নামের সংগঠন। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত ফি দেওয়া সত্ত্বেও দেশের ৫৭ শতাংশ ছাত্রী হলে থাকার সুযোগ পান না। অন্যদিকে, অনাবাসিক ছাত্রীদের একটু বিশ্রাম নেওয়া বা রাতে থাকার জন্য হলে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও ‘অবরোধবাসিনী’র সদস্য মিশকাতুল মাশিয়াত বলেন, রাত ১০টার পর বাইরে থাকা নাকি নিরাপদ নয়–প্রশাসনের এই কথা আসলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার একটি অজুহাত।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব প্রক্টর দলের। তারা যদি দিনেদুপুরেও যৌন হয়রানি আটকাতে না পারে, তবে রাতে নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না এমন অজুহাত তোলার যুক্তি কী?

মাশিয়াতের মতে, ছাত্রীদের হলের ভেতর আটকে রাখা কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। ঢাকার বাইরে বাড়ি থেকে ফিরতে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে রাতে দেরি হলে ছাত্রীরা যে হয়রানির শিকার হন, তার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে।

যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলের ছাত্রী ইশরাত জাহান ইমু চট্টগ্রাম থেকে ফেরার সময় সাধারণ সময়ের অনেক আগেই ক্যাম্পাসে পৌঁছে যান। সাধারণত তিনি ভোর ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে হলে ফেরেন। কিন্তু একদিন রাস্তায় যানজট না থাকায় তিনি ভোর ৫টাতেই চলে আসেন। নিয়ম অনুযায়ী তখনো হলের গেট খোলা হয়নি, তাই তাকে বাইরেই অপেক্ষা করতে হয়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাং বলেন, পৃথিবীর কোথাও হয়রানি বা নিরাপত্তার ঝুঁকি শতভাগ দূর করা সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয় তো আর প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দিতে পারবে না, এই সত্যটা সবাইকে বুঝতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আইন, সামাজিক বাস্তবতা আর আমাদের সংস্কৃতি–সবকিছুই ভাবতে হবে। আমরা কি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ভুলে যাব, নাকি আমরা ইউরোপ হয়ে যাব? তিনি প্রশ্ন করেন, কোনো বাবা-মাই চান না তাদের মেয়ে রাত ১০টার পর বাইরে থাকুক। কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তবে সেটা দিয়ে তো আর সবার কথা ভাবা যায় না।’

তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশাসনের এসব চিন্তাভাবনা আজকের কাজের বাজারের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। মিশকাতুল মাশিয়াত জানান, এখন ছাত্রীদের সাংবাদিকতা, টিউশন বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। হলের এই নিয়মের কারণে ছাত্রীরা হয় কাজের সুযোগ হারাচ্ছেন, না হয় ক্যারিয়ারের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছেন।

হলে থাকার শর্ত হিসেবে ক্যারিয়ারের সুযোগ ছেড়ে দেওয়াকে বর্তমান যুগের সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তানিয়া হক মনে করেন, ছেলে ও মেয়েদের জন্য নিয়ম একই হওয়া উচিত। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘নিরাপত্তাই যদি আসল কারণ হয়, তবে এই নিয়ম শুধু মেয়েদের জন্য কেন? ছেলেদের জন্য সব খোলা রেখে মেয়েদের খাঁচায় আটকে রাখা হচ্ছে কেন?’

তিনি আরও বলেন, শালীনতার নিয়ম ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই সমান হওয়া দরকার। নিরাপত্তার নিয়ম সবার জন্য এক হলে আলাদা করে কোনো সান্ধ্য আইনের দরকার পড়বে না।

তবে এই বিতর্ক আজকের নয়। রাজু ভাস্কর্যের এক সমাবেশে ‘নারীপক্ষ’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হক জানান, আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেও তারা হলের এই সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনের ফলেই হলে ঢোকার সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাড়িয়ে রাত ১০টা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, তারা লড়াই করে সময় কিছুটা বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু বৈষম্য শেষ করতে পারেননি। আজ যারা রাজপথে নেমেছে, তারা সরাসরি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলছে।