শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও বাঙালির জাতীয় চেতনার অন্যতম প্রধান বাতিঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছর পূর্ণ করে আজ ১০৬ বছরে পদার্পণ করেছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক রূপান্তর এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হয়ে সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান- প্রতিটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল নজির স্থাপন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এবারের বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়'।
মাত্র তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন শিক্ষার্থী এবং তিনটি আবাসিক হল নিয়ে ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। শতবর্ষ পেরিয়ে আজ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, প্রায় দুই হাজার শিক্ষক, প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী, ১৯টি আবাসিক হল ও চারটি হোস্টেল। শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত পরিসরে এটি এখনও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—দেশের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এসব আন্দোলনে অসংখ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী জীবন দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট-পাথরে তাই জড়িয়ে আছে আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস। সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা, সংগঠন ও নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। জুলাই-আগস্টজুড়ে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক কর্মসূচি, গণমিছিল ও প্রতিরোধ দেশব্যাপী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে। ছাত্র-জনতার সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পথ তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়, জাতীয় সংকটের মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অন্যতম চালিকাশক্তি।
দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, আমলা, অর্থনীতিবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, গবেষক ও কূটনীতিকের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ কারণেই অনেকেই একে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হৃদস্পন্দন বলে অভিহিত করেন।
গৌরবের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়
শিক্ষাবিদদের মতে, এক শতাব্দীর বেশি সময়ের যাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন অসংখ্য মেধাবী মানুষ তৈরি করেছে, তেমনি রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষক নিয়োগে বিতর্ক, গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিকীকরণের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক নানা সংকটও এর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে হলে গবেষণা, উদ্ভাবন ও একাডেমিক স্বাধীনতাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয়টি রাষ্ট্রীয় বৈরিতার মুখে পড়েছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যত ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার পরও রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক সবসময় প্রত্যাশিত মাত্রায় গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন।
তার মতে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ায় অনেক শিক্ষার্থী এখন কেবল চাকরিমুখী হয়ে উঠছে।
গবেষণায় এখনও দেশের শীর্ষে
নানা সীমাবদ্ধতা ও অর্থসংকটের মধ্যেও গবেষণায় দেশের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২৫ সালে স্কোপাস ইনডেক্সড জার্নালে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও গবেষকেরা ১ হাজার ৭৮৯টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, যা দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা ছিল ৮০৪টি এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭৮টি।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের সেরা অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের ৫৮৪তম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অবস্থান বজায় রাখে। কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে এশিয়ার ১৩২তম স্থান এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে ৮০১–১০০০-এর মধ্যে অবস্থানও বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক অগ্রগতির প্রতিফলন। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিশ্বসেরাদের কাতারে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
বিশ্বসেরাদের কাতারে নেওয়ার পরিকল্পনা
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গৌরবময় প্রতিষ্ঠান। এই ঐতিহ্য ধরে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কাজ চলছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং একাডেমিক পরিকল্পনাকে সমন্বয় করে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় বলে গর্ববোধ করবেন।
তিনি আরও বলেছেন, ১০৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে অসংখ্য রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, গবেষক ও মেধাবী মানুষ উপহার দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ ও গবেষণার পরিবেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণের প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০ বছর মেয়াদি একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সুশাসনের সমন্বয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে নিয়ে যাওয়াই বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য।
যে ইতিহাসের শুরু ১৯১২ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মও ছিল দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির ফসল। বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ব বাংলার মানুষের উচ্চশিক্ষার দাবির প্রেক্ষাপটে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। পরে নাথান কমিশন ও স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ১৯২০ সালে 'দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট' পাস হয়। সেই আইনের ভিত্তিতেই ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বর্ণাঢ্য আয়োজন
এবারের বিশ্ববিদ্যালয় দিবস দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হবে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হবে শোভাযাত্রার। পরে টিএসসি মিলনায়তনে হবে আলোচনা সভা। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।