ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ আখ্যা দিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সাম্প্রতিক মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন। তিনি বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা কার্যক্রমকে খাটো করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করা তথ্যভিত্তিক নয় এবং তা ক্ষোভের জন্ম দেয়।
শনিবার (৩০ মে) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন এসব কথা বলেন।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, আমিতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলি কোচিং সেন্টার! ববি হাজ্জাজ যদি এইখানেই থামতেন আমার কোন রকম আপত্তি থাকতো না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যখন নর্থ সাউথ কিংবা ব্র্যাকের সাথে তুলনা করে বলেন এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যেই পরিমান গবেষণা হয় তার কানাকড়িও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় না। তখন শুধু দ্বিমত না সাথে প্রচন্ড ক্ষোভ বোধ করেছি। এর কারণ আপনি নিজে সরকারের মন্ত্রী হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও খারাপ করার সকল রকম কাজ করে এখন তাকেই blame করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার চেয়ে কঠোর সমালোচনা কেউ করেছে বলে আমার জানা নাই। কিন্তু আপনার মত এইরকম সমালোচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিজার্ভ করে না।
তিনি বলেন, আপনি কি জানেন যে শুক্র শনিবার নর্থ সাউথের ক্যাম্পাসে গেলে মনে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন? কারণ সেই দিন সেখানকার প্রায় সকল শিক্ষকই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গিয়ে পার্ট-টাইম ওখানে পড়ায়। Mr. Hajjaj আপনি কি কখনো খোঁজ নিয়ে জেনেছেন কেন এত এত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আপনার প্রাক্তন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন পড়ায়? একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ বা ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বেতন পায়। অথচ একই শহরে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাপকের বেতন ৩ গুনের বেশি।
‘এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পার্ট-টাইম পড়ায় এতে কি গবেষণার ক্ষতি হয় না। আমার এক রিসার্চ কলাবোরেটর আছে যিনি আমেরিকার এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি সেখানকার ডিন তাই শ্রেণীকক্ষে পাঠ দান ছাড়াও কিছু অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সেমিস্টার চলাকালীন সময়ে আমাদের আর্টিকেল লেখার কাজ প্রায় থেমে থাকে। সেমিস্টার break-এ দিনে ৫ থেকে ৭টি ইমেইলও চালাচালি হয়।’
ড. মামুন বলেন, এ থেকে কি বুঝলেন শিক্ষকরা যদি নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণীকক্ষে পাঠ দানের পাশাপাশি ঢাকা শহরের মত প্রচন্ড ট্রাফিক জামের শহরের অন্য প্রান্তের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট টাইম পড়াতে যায় গবেষণা কিভাবে হবে? কিভাবে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট সময় দিবে? কিভাবে ক্লাস প্রস্তুত করবে? এত কম বেতন পায় যে অধিকাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন ২ থেকে ৩ এমনকি চার জায়গায়ও পড়ায়। পৃথিবীর কোথাও এমন নজির আছে আছে যে জীবন চালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এইভাবে কিছুটা অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য এত দৌড়াদৌড়ি করতে হয়? তারপরেও এই শিক্ষকরা কিন্তু ঘুষ দুর্নীতি করছে না। নিজ দেশের ছেলেমেয়েদের পড়িয়েই নিজ পরিবারের একটু স্বচ্ছন্দের জন্য এত পরিশ্রম করছে। এতসব করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনা পত্রের সংখ্যা ও মানের দিক থেকে দেশের শীর্ষে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবাই পার্ট টাইম পড়ায় না। কেউ কেউ রাজনীতিতে জড়িয়ে একটু ভালো থাকার চেষ্টা করে। শিক্ষকদেরকে এই পথে রাষ্ট্রই কিন্তু ঠেলে দিয়েছে। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিন্তু নিজ যোগ্যতা দিয়ে স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ নিয়ে বিদেশে গিয়ে পিএইচডি করে। একজন শিক্ষক অনার্স মাস্টার্সে অত্যন্ত ভালো করে যোগ্যতা প্রমান দিয়ে রাষ্ট্রের একটি টাকা কড়ি ব্যয় না করে স্কলারশিপ ও ফেলোশিপ নিয়ে পিএইচডি করে তারপর কেউ কেউ সেই পিএইচডি মান প্রমান সাপেক্ষে পোস্ট-ডক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে।
‘রাষ্ট্র কি এই মেধাবীদের মূল্যায়ন করছে? পুরো পৃথিবীর কথা বাদ দিলাম খোদ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম বেতন পায় বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাংলাদেশের স্কুল কলেজের শিক্ষকরা। এরপরও যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও রেঙ্কিং-এ বাংলাদেশের শীর্ষে এটাই বরং আশ্চর্যের। এর বিনিময়ে আপনারা কি করেন? শিক্ষকদের নিয়ে কটু কথা বলেন। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়কে খারাপ করার জন্য যতকিছু করা যায় আপনারা করেন।’
স্ট্যাটাসের শেষাংশে ববি হাজ্জাজের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘মি. হাজ্জাজ, আপনার কি ধারণা আছে ৩৫-৪০ হাজারের ছাত্রছাত্রীদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কেমন হওয়া উচিত? আপনার কি ধারণা আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর আবাসিক কতটা আরামদায়ক হওয়া উচিত? একটু জেনে বুঝে সমালোচনা করবেন প্লিজ।’