Image description

হঠাৎ করেই পরিবারের সবার বড় শিশুটি অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। শুরুতে শিশুটিকে শাসন করলেও পরে সামনে আসে অদ্ভুত সব ঘটনা। মানসিকভাবে শিশুটি সংকটের মুখে পড়ে। কোনো বিস্ফোরক ঘটনা নয়; বরং একটি পরিবারের ভেতরে জমে থাকা অপ্রকাশিত বেদনা, মানসিক সংকট এবং শৈশবের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে কানাডীয় চলচ্চিত্র ‘ব্লু হেরন’।

এটি নির্মাণ করেছেন কানাডীয় পরিচালক সফি রোমভারি। এটি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সিনেমাটি টরন্টো, লোকার্ন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে পুরস্কার ও প্রশংসা পেয়ে আলোচনায় আসে। পরিচালক নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন।

সিনেমাটির পোস্টার
সিনেমাটির পোস্টার

শিশুর চোখে বড়দের গল্প
সিনেমাটির গল্পের প্রেক্ষাপট ১৯৯০ দশকের শেষভাগের। হাঙ্গেরি থেকে কানাডায় অভিবাসী হয়ে আসে একটি পরিবার। এই পরিবারে ছয় সদস্যের জায়গা হয় ভ্যাঙ্কুভার আইল্যান্ডের একটি বাড়িতে। সেখানে তারা বসবাস শুরু করে। নতুন দেশ, নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ—সব মিলিয়ে নতুন জীবন, সবকিছুই যেন নতুন শুরুর ইঙ্গিত দেয়। শুরুতে স্বাভাবিক মনে হলেও গল্পটি পরিচালকের কাছ থেকে দেখা। এটি তাঁর শৈশবের গল্প। পরিচালক গল্পটি দেখিয়েছেন, পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য আট বছরের সাশার চোখ দিয়ে। শিশুটির সরল পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে দর্শক বুঝতে পারেন, পরিবারের বাইরের শান্ত জীবনের আড়ালে জমে আছে অস্থিরতা, ভয় এবং না–বলা অসংখ্য কথা।

যা বদলে দেয় সবকিছু
শৈশব কাটানো নিজের জন্মস্থান ছেড়ে এসে এই শিশুরা নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছিল দ্বীপে। এর মধ্যেই গল্পের বড় সংকট তৈরি হয় সাশার বড় ভাই জেরেমিকে ঘিরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেরেমির আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কখনো তীব্র রাগ, কখনো হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া, আবার কখনো ধ্বংসাত্মক আচরণ পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। মা–বাবা বুঝতে পারে না, কীভাবে ছেলেকে সামলাবে; মারবে, শাসন করবে নাকি ভালোবাসা দিয়ে আগলে নেবে? তৈরি হয় সংকট। অন্যদিকে ছোট্ট সাশা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে, বড়দের পৃথিবী সব সময় যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পরিবারের অনেক সংকটের কোনো সহজ সমাধানও নেই। এই ঘটনাগুলো শিশুমনে অস্থিরতা তৈরি করে।

সিনেমাটির কিছু দৃশ্য
সিনেমাটির কিছু দৃশ্যছবি: আইএমডিবি

শুধুই পারিবারিক নাটক নয়
সিনেমাটিকে একটি পারিবারিক বা ফ্যামিলি ড্রামা মনে হলেও এতে শৈশবের স্মৃতি, অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিচালক, যা বিশ্বের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। দিন দিন বহু মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, নিরাপত্তাসহ বহু কারণে অনেকেই দেশ ছাড়ছেন। দেশান্তর শিশুদের মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে যায়, যা আড়ালেই থেকে যায়। এমন ঘটনাগুলো শিশুদের একসময় পারিবারিক ট্রমার গভীরে নিয়ে যায়। ভ্যারাইটিতে পরিচালক বলেছেন, ‘একটি শিশু পরিবারের সংকটকে যেভাবে দেখে, তা বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। শিশুর কাছে অনেক ঘটনা রহস্যময়, বিভ্রান্তিকর এবং কখনো কখনো ভয়ংকর হয়ে ওঠে।’

অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা বর্জন
সিনেমাটির অন্যতম শক্তি এর নির্মাণভঙ্গি। পরিচালক সফি রোমভারি অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা এড়িয়ে নীরবতা, দীর্ঘ শট, ঘরের স্বাভাবিক শব্দ, প্রকৃতির দৃশ্য এবং চরিত্রগুলোর সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির মাধ্যমে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন। অতি সংলাপ বর্জন করা হয়েছে। তার জায়গায় পরিবেশের সঙ্গে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক দিক, আলো–আঁধারের খেলা, নীরবতা এবং স্মৃতির অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কারণে সিনেমাটি প্রশ্ন করে, একটি পরিবার মানসিক সংকটের মুখোমুখি হলে কীভাবে টিকে থাকে? শিশুরা বড়দের আচরণ কীভাবে বুঝতে শেখে? শুধু তা–ই নয়, শিশুরা শৈশবের ট্রমা নিয়েই বড় হতে থাকে। এই ট্রমা কখনোই মুছে যায় না। যা দিন দিন আরও মানসিক সংকট তৈরি করে। ঘটনাগুলো শিশুর বেড়ে ওঠার ওপর প্রভাব ফেলে। একসময় বাস্তবতাকে আলাদা করে দেয়।

লোকার্ন উৎসবে পুরস্কার হাতে পরিচালক
লোকার্ন উৎসবে পুরস্কার হাতে পরিচালকছবি: উৎসবের সাইট থেকে

পরিচালকের ব্যক্তিগত অনুভূতি গল্প
‘ব্লু হেরন’ আলোচনায় এসেছে আরও কয়েকটি কারণে। এর আগে সফি রোমভারি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা বানালেও এটি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। প্রথম সিনেমাতেই রয়েছে পরিপক্বতার ছাপ। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে গল্প নির্মাণ করায় সিনেমাটিতে বাস্তবতার ছাপ ঘুরে–ফিরে এসেছে। শৈল্পিক এই সিনেমায় পরিবার, শোক, অভিবাসী জীবনের অনিশ্চয়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। যে কারণে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতেও সিনেমাটি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।

পরিচালক লোকার্ন উৎসবে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ আমাকে একজন নির্মাতা হিসেবে আত্মবিশ্বাস এবং নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। এখন ফিরে তাকালে দেখি, আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে “ইটস হোয়াট ইচ পারসন নিডস” পর্যন্ত একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সেই ভাষা তৈরি করার পরই “ব্লু হেরন”-এ আমি নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পেরেছি। কারণ, এ গল্পটি আমার।’ সাক্ষাৎকারে পরিচালক আরও জানান, বড় কোনো নাটকীয় ঘটনার চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবারের নীরব ভাঙন এবং একজন শিশুর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার দিকে। ধীরগতির, সংবেদনশীল এবং গভীর মানবিক এই চলচ্চিত্র দর্শককে সহজ উত্তর দেয় না; বরং পরিবার, স্মৃতি এবং মানসিক ক্ষত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

সিনেমার টুকিটাকি
খুবই কম বাজেটের এই ইন্ডি সিনেমায় প্রধান চরিত্র সাশা। এ চরিত্রে অভিনয় করেছে আইয়ুল গুভেন। প্রাপ্তবয়স্ক সাশা চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যামি জিমার। জেরেমি চরিত্রে অভিনয় করেছেন এডিক বেডোজ। মায়ের চরিত্রে ইরিঙ্গো রেতি এবং বাবার চরিত্রে আদাম তোম্পা। সিনেমাটির আইএমডিবি রেটিং ৭.১। এখনো সিনেমাটি বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হচ্ছে। সিনেমাটি আগামী মেলবোর্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হবে। সিনেমাটি লোকার্ন উৎসব থেকে স্পেশাল মেনশনসহ দুটি পুরস্কার পায়। টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব থেকে বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড জয় করে।

রোটেন টমেটোজ ডটকম, ভ্যারাইটি ও আইএমডিবি অবলম্বনে