Image description

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান হিসেবে জেরোম পাওয়েল দায়িত্ব নেন ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। তাকে মনোনীত করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সুদের হার বাড়ানোয় ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার টানাপড়েন শুরু হয়। ট্রাম্প দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও শেয়ারবাজারের উত্থান ধরে রাখতে কম সুদহার চেয়েছিলেন। কিন্তু পাওয়েল অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ শেষে ২০২১ সালে জো বাইডেন ক্ষমতায় আসেন। ২০২১ সালের নভেম্বরে পাওয়েলকে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনর্নিযোগ করে বাইডেন প্রশাসন। করোনা-পরবর্তী উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পাওয়েল কঠোরভাবে সুদের হার বাড়ান। এতে তিনি ডেমোক্র্যাটদের তোপের মুখে পড়েন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদের সময়ে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরে এলে পাওয়েলের সঙ্গে তার পুরনো নীতিগত বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ঘোষণা দেন তিনি পাওয়েলকে গভর্নর হিসেবে দেখতে চান না। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাকে সরানোর আইনি জটিলতার ঝুঁকি এড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত নীরব থাকে। নানামুখী চাপ সত্ত্বেও পাওয়েল স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি পরিচালনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর দায়িত্বগুলোর একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের পদ। অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারী, যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বা রাজনৈতিক পালাবদল—সব ধরনের প্রতিকূলতায় অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার বড় দায়িত্ব এসে পড়ে এ পদটির ওপর। পরিস্থিতি সামাল দিতে গভর্নরদের নিতে হয় কঠোর ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও, যা বিভিন্ন পক্ষকে অসন্তুষ্ট করতে পারে। তবু বহু দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা আর্থিক বিপর্যয়ের মতো সময়ে নতুন সরকার দ্রুত রদবদলের পথে না গিয়ে নীতির ধারাবাহিকতা এবং বাজারের আস্থা ধরে রাখাকেই বেশি অগ্রাধিকার দেয়।

এ বাস্তবতার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা। ২০১৩ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি একের পর এক বড় ধাক্কার মুখোমুখি হয়ে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে চলছেন। ২০১৪ সালের ক্রাইমিয়া সংকট-পরবর্তী পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি তেলের দামে পতন এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর নজিরবিহীন আর্থিক অবরোধ। প্রতিটি পর্যায়েই রুবল, ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে চাপ তৈরি হয়। সংকট গভীর হলে নাবিউলিনা দ্রুত সুদের হার বাড়ানো, পুঁজিপ্রবাহে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং আর্থিক খাতে কড়াকড়ি তদারকির মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। এক যুগ ধরে রুশ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছেন এলভিরা। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের এপ্রিলে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত পুতিনের অনুরোধে দায়িত্বে থেকে যান। এরপর বিভিন্ন সময় তার দায়িত্ব ছাড়ার গুঞ্জন চাউর হয়। ফলে রাশিয়ান বন্ড ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতাও দেখা দেয়। এ অবস্থায় গত বছর পুতিনকে ঘোষণা দিতে হয় অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন এলভিরা। রুশ বিশ্লেষক ইয়েভগেনিয়া আলবাতসের ভাষায়, ‘এলভিরা নাবিউলিনা সম্ভবত রাশিয়ার একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পুতিনকে এমন কথাও বলতে পারেন যা তিনি শুনতে চান না।’

 

রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের অভিভাবক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। মূল্যস্ফীতি কত হবে, বাজারে টাকার প্রবাহ কতটা থাকবে, ঋণের খরচ বাড়বে না কমবে, মুদ্রার বিনিময় হার কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা, আর্থিক বাজারে তারল্য নিশ্চিত করা এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গভর্নরের নেতৃত্বই নির্ধারণ করে নীতির দিকনির্দেশনা।

 

মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অধিকাংশ দেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে। কারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল নীতি প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ত আছে কিনা, ঋণ বিতরণে নিয়ম মানা হচ্ছে কিনা, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কতটা, আর্থিক খাতে সুশাসন বজায় আছে কিনা—এসব বিষয় তদারকির দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

সংকটকালে এ দায়িত্ব আরো বিস্তৃত হয়। মহামারীর সময় উৎপাদন ও বাণিজ্য থমকে গেলে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য সরবরাহ, ঋণ পুনঃতফসিল, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের মতো পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিতে হয়। অর্থনৈতিক মন্দার সময় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সুদের হার কমানো, আবার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বা বৈদেশিক লেনদেনে চাপ তৈরি হলে মুদ্রা ও রিজার্ভ রক্ষায় কড়াকড়ি আরোপ—এ দুই বিপরীতধর্মী নীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই গভর্নরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এ পদে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে পেশাগত দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পায়। যে কারণে অনেক দেশই এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের পেশাদারত্ব ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেয়। অনেক সময় জাতীয়তার গণ্ডিও এখানে মুখ্য হয়ে থাকে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইংল্যান্ড। ব্রিটিশদের মতো একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ৩০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নন-ব্রিটিশ তথা কানাডিয়ান নাগরিক মার্ক কার্নিকে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। নিজ দেশের বাইরে গিয়ে অন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়া তো বটেই, একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের সংকট সামাল দেয়ার উদাহরণ তৈরি করেছিলেন কার্নি।

মার্ক কার্নি কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের ঠিক আগে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় বড় ব্যাংক ধসে পড়লেও কানাডার আর্থিক খাত তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে। দ্রুত সুদের হার কমানো, ব্যাংক খাতে কঠোর তদারকি বজায় রাখা এবং তারল্য সহায়তা বাড়ানোর মাধ্যমে তিনি ঋণপ্রবাহ সচল রাখেন।

২০১৩ সালে তিনি যখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন তখন যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তিনি ফরওয়ার্ড গাইডেন্স নীতি চালু করে বাজারকে সুদের হার সম্পর্কে আগাম ধারণা দেন, যাতে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা কমে এবং ঋণগ্রহণ ও বিনিয়োগ বাড়ে। তার মেয়াদকালে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা আসে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট ঘিরে। গণভোটের ফল ঘোষণার পর পাউন্ডের দর দ্রুত পড়ে যায়, পুঁজিবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে কার্নি জরুরি ভিত্তিতে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য সরবরাহের ঘোষণা দেন এবং সুদের হার কমান, যাতে আর্থিক খাতে ধাক্কা না লাগে।

কার্নি যখন ২০১৩ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন তখন ক্ষমতায় ছিল ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ–লিবারেল ডেমোক্র্যাট জোট সরকার। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিটের পর ক্যামেরন পদত্যাগ করলে থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী হন। এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যেও কার্নিকে দায়িত্বে রাখা হয়। থেরেসা মের পর বরিস জনসনের সরকারেও তিনি একই পদে বহাল ছিলেন।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ঝু সিওচুয়ান ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে পিপলস ব্যাংক অব চায়নার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ওই পদে ছিলেন তিনি। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বে একাধিক পরিবর্তন এলেও তাকে সরানো হয়নি। ঝু দায়িত্ব নেন জিয়াং জেমিনের শেষ সময় এবং প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজির প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে। এরপর পুরো মেয়াদজুড়ে তিনি কাজ করেন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও ও প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের আমলে। পরবর্তী সময়ে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর এবং প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সময়েও তিনি গভর্নর হিসেবে বহাল থাকেন।

ঝু সিওচুয়ান দায়িত্ব নেয়ার সময় চীনের ব্যাংক খাত ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ঋণের চাপে দুর্বল এবং খেলাপি ঋণের হার ছিল উচ্চ। তিনি প্রথমেই ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন, খারাপ ঋণ আলাদা করার জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আর্থিক খাত আংশিক উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। ২০০৫ সালে ইউয়ানের বিনিময় হার ডলারের সঙ্গে স্থির না রেখে নিয়ন্ত্রিত ভাসমান ব্যবস্থায় নেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তার সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর হিসেবে স্ট্যানলি ফিশারের দায়িত্বকালও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও নীতির ধারাবাহিকতার অন্যতম উদাহরণ। ২০০৫ সালে তাকে নিয়োগ দেয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনের সরকার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিশ্বব্যাংক–ফেড–একাডেমিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাকে আনা হয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে। দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ইসরায়েলের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। শ্যারন অসুস্থ হয়ে পড়লে এহুদ ওলমার্ট প্রধানমন্ত্রী হন। সেই সরকার পরিবর্তনের পরও ফিশার গভর্নর হিসেবে বহাল থাকেন এবং একই সঙ্গে মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় এলে নতুন সরকারও তাকে সরায়নি; বরং তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। অর্থাৎ শ্যারন, ওলমার্ট ও নেতানিয়াহু—তিন ভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সময় তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর জেতি আখতার আজিজের দায়িত্বকালকে দেশটির আর্থিক খাত পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সময় হিসেবে দেখা হয়। ২০০০ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর টানা ১৬ বছর তিনি এ পদে ছিলেন। তাকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় মাহাথির মোহাম্মদের সরকারের সময়। মাহাথির সরকারের শেষ সময়জুড়ে তিনি আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন। ২০০৩ সালে আবদুল্লাহ আহমদ বাদাবি প্রধানমন্ত্রী হলে জেতিকেই গভর্নর হিসেবে বহাল রাখেন। ২০০৯ সালে নাজিব রাজাক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও জেতি আখতার আজিজ একই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে টিটো মবোওয়েনির দায়িত্বকাল ছিল বর্ণবাদ-পরবর্তী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৯৯ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থাবো এমবেকির সরকার তাকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার সময়েই দক্ষিণ আফ্রিকা আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। ২০০১ সালে র‍্যান্ডের তীব্র অবমূল্যায়ন তার দায়িত্বকালের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল। সে সময় সুদের হার বাড়ানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০০৯ সালে জ্যাকব জুমা ক্ষমতায় এলেও মবোওয়েনি তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পর্যন্ত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়াদ শেষ করেই তিনি বিদায় নেন।

মরক্কোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক আল-মাগরিব’-এর গভর্নর হিসেবে ২০০৩ সালে নিয়োগ পান আবদেল্লাতিফ জুয়াহরির। এর পর থেকে তিনি টানা একই পদে আছেন। তার দায়িত্বকালে মরক্কোর রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন সরকার গঠিত হয়েছে—ড্রিস জেত্তুর সরকার থেকে শুরু করে আব্বাস এল ফাসি, আবদেলিলাহ বেনকিরান, সাদেদ্দিন এল ওসমানি এবং সর্বশেষ আজিজ আখানুশের সরকার—সবগুলোর সময়ই তিনি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় মরক্কোতে রাজনৈতিক সংস্কার হয় এবং নতুন সংবিধান কার্যকর হয়। বিভিন্ন পদে পরিবর্তন এলেও তাকে বহাল রাখা হয়।

শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের সরকার নন্দলাল বীরাসিংহেকে নিয়োগ দেয়। এর কয়েকদিনের মধ্যে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেশটি। ওই বছরের জুলাইয়ে গণ-আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান গোতাবায়া রাজাপাকসে। তার পলায়নের পর পি নন্দলাল বীরাসিংহে এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকার গঠন না হলে কারো পক্ষেই শ্রীলংকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। এমনকি পদত্যাগের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। এরপর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন রনিল বিক্রমাসিংহে। তার সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু করে বীরাসিংহেকে নেতৃত্বে রেখে। পরবর্তী সময়ে অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকের সরকার ক্ষমতায় এসেও নন্দলাল বীরাসিংহেকে বহাল রেখেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও গভর্নরের মেয়াদের নিরাপত্তা সরাসরি একটি দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। যে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যত বেশি স্বাধীন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, সে দেশে মুদ্রাস্ফীতি ততটাই নিয়ন্ত্রিত থাকে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সময় গভর্নর বদল না করার মাধ্যমে রাষ্ট্র মূলত আন্তর্জাতিক বাজার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে বার্তা দেয় যে তাদের আর্থিক নীতি কোনো গোষ্ঠী বা দলের মর্জির ওপর নয়, বরং পেশাদার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।