ভোট শেষ হয়েছে। অনেক আগেই নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় নির্বাচনের উত্তাপ এখনো ঠান্ডা হয়নি। ভোটের ‘ভুল’ সিদ্ধান্তের জন্য এখন শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে কিছু মানুষকে। কারও ওপর চলছে মারধর, কাউকে পিটিয়ে পানিতে নামিয়ে ডুব দিয়ে জোরপূর্বক ‘অজু’ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কাউকে বাধ্য করা হচ্ছে নিজের ভোটকে জীবনের ‘সবচেয়ে বড় ভুল’ বলে স্বীকার করতে।
সম্প্রতি এমন বেশ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, মইদুল ইসলাম নামে একজন কাঠমিস্ত্রি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে লাঠি হাতে কয়েকজন যুবক। গালাগালি করতে করতে তাকে জেরা করা হচ্ছে, ‘আপনি বিএনপি করেন না? তাহলে ফুটবলের ভোট করলেন কেন?’
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর ‘ফুটবল’ প্রতীকে ভোট করায় মইদুলকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। একপর্যায়ে তাকে মারধর করে পুকুরের পানিতে নামানো হয়। বলা হয়, ‘অজু করেন, একবারে পবিত্র হয়ে ওঠেন।’
পানিতে ডুব দিয়ে একগলা পানিতে দাঁড়িয়ে তিনি অজু করেন। এরপর তাকে বলতে বাধ্য করা হয়—‘আমি বিএনপি করি। ফুটবলের ভোট করেছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। এই ভুল আর জীবনে করব না।’ ভিডিওটি বিএনপিদলীয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের নাতি রিকো মণ্ডল প্রকাশ করেছেন—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
শুধু মইদুলই নন, একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন আব্দুল জব্বার চান্দু। তিনি পুঠিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি।
নির্বাচনের পরদিন তাকে মারধর করে মোটরসাইকেলসহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। চান্দু এখন এলাকায় নেই। ঢাকায় আত্মগোপনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চান্দু কালবেলাকে বলেন, ‘ওরা যাকে পাচ্ছে তাকেই মারছে। এলাকায় ভয়ের পরিবেশ। আমি ভয়ে থাকতে পারিনি।’ তিনি জানান, থানার ওসি ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। মোটরসাইকেলটি পুকুর থেকে তুলে থানায় রাখা হয়েছে।
চান্দু ও মইদুলের মতো উপজেলার রামজীবনপুর মহল্লার দুলাল হোসেনও মারধরের শিকার হয়ে কয়েকদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এখন বাড়িতে থাকলেও বাইরে বের হতে ভয় পান।
বাগানপাড়া এলাকার আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ শেখের পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে ঘরে পড়ে আছেন তিনি। এমনকি পুঠিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও একটি জাতীয় দৈনিকের উপজেলা প্রতিনিধি আরিফুল হক রুবেলও রেহাই পাননি। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে তাকে মারধর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের বিএনপিদলীয় এমপি নজরুল ইসলাম মণ্ডলের নাতি রিকো মণ্ডল, আলী হোসেন ভুট্টু, মো. রুবেল, মুন্না, সাগর, রকিসহ কয়েকজন এসব ঘটনায় জড়িত। ভুট্টু নিজেকে যুবদলের সাবেক নেতা পরিচয় দিলেও এলাকাবাসীর দাবি, তিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ভুট্টুর কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ম্যালা মানুষকেই পানিতে চুবানোর নিয়ত ছিল। পারিনি। এখন এসব বিষয় নিয়ে একটু ঝামেলায় আছি।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠ সাবেক পৌর মেয়র আল-মামুন খান বলেন, ভোটের পর অন্তত ১০ জনকে মারধর করা হয়েছে। অনেককে হুমকি দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। পরিকল্পিতভাবে ভয় দেখানো হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিএনপিদলীয় নবনির্বাচিত এমপি নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘আমি এসব বিষয় শুনেছি। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে আমার স্পষ্ট নির্দেশনা আছে।’ জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না সে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা বসব।’