Image description
চলছে বিশেষ ব্লক রেইড

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবরে অপরাধ দমনে ভিন্ন কৌশলে মাঠে নেমেছে পুলিশ। জিরো টলারেন্স নীতিতে কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে চলছে টানা সাঁড়াশি অভিযান। মাত্র দুদিনেই গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় দেড়শজনকে। পুলিশের পাশাপাশি অভিযানে অংশ নিচ্ছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, ডিএমপির সিটিটিসির বিশেষায়িত টিম এবং কে-নাইন ডগ স্কোয়াড।

বুধবার যুগান্তরে ‘মোহাম্মদপুর-আদাবর : আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। ওই দিনই মোহাম্মদপুর ও আদাবরে সাঁড়াশি অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত টানা ৪ ঘণ্টার অভিযানে বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ স্পট থেকে আটক করা হয় শতাধিক ব্যক্তিকে। পরে তাদের মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানায় সোপর্দ করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেনেভা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয় বিশেষ ব্লক রেইড। চারটি প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে ‘কে-নাইন ইউনিট’ তল্লাশি চালায় অলিগলি ও সন্দেহভাজন আস্তানায়। সিটিটিসির সদস্যরা প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানে সহযোগিতা করেন। এদিনও অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। কয়েকজনের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযান চলাকালে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোহাম্মদপুরে যান পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আলী হোসেন ফকির। দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই তিনি সরেজমিন পরিস্থিতি দেখতে রাস্তায় নামেন। সঙ্গে ছিলেন ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার ও তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান।

জেনেভা ক্যাম্প, টাউন হল ও তিন রাস্তার মোড় পরিদর্শন শেষে আকস্মিকভাবে মোহাম্মদপুর থানা ঘুরে দেখেন আইজিপি। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নগরবাসীর নিরাপত্তায় আমি নিজেই রাস্তায় নেমে এসেছি। অপরাধী যে-ই হোক, কঠোরহস্তে দমন করা হবে। কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের তৎপরতায় সাধারণ মানুষ ভীত। তাই সন্ধ্যার পর বিশেষ ব্লক রেইড জোরদার করা হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন না করে প্রচলিত আইনের মধ্যেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘হোয়াইট-কলার’ অপরাধীরাও নজরদারির বাইরে নয়।

১৯৮৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় নিজে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন আইজিপি। তার ভাষায়, মোহাম্মদপুর দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। অবৈধ ব্যবসা ও সড়ক দখলের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে অর্থনীতি ও বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি জুয়েল রানা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে-কোনো অপরাধীকে ন্যূনতম ছাড় দেওয়া যাবে না। দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ রয়েছে।

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, তালিকা ধরে ধরে অভিযান চলছে। যারা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অভিযানের চাপে অনেক শীর্ষ অপরাধী এখন এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কেউ সাভার, কেউ কেরানীগঞ্জে গা ঢাকা দিয়েছে। সুযোগ পেলেই এসে অপরাধ করে সরে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত এক বছরে একাধিক শীর্ষ অপরাধী গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়েছে অনেকে। এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক অভিযানে অপরাধীদের মধ্যে দৃশ্যমান ভীতি তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ে। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং ও মাদক ব্যবসায়ীরা যাতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য মোহাম্মদপুর ও আদাবরে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার ৩৮ : রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ৩৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুক্রবার ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে বুধবার মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ৯৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার গ্রেফতারদের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দস্যুতা ও চুরির অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয়েছে। তিনজনকে আগের গ্রেফতারি পরোয়ানায় আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া বাকি ২৮ জনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় বিভিন্ন আইনে মামলা দিয়ে তাদের ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়। গ্রেফতাররা হলো-মনির, আরিফ, সোহান, হৃদয়, সোহেল, মাহিম ওরফে সায়েম, রমজান, সাব্যস্ত, জুবায়ের, রুবেল ওরফে বাদশা, রিয়াজ, গোলাপ মোস্তফা, সানি, হানিফ, ফয়সাল, রহমতুল্লাহ, জাকির, আবদুল সালাম, রুমন, হাসান, রফিক, রাব্বি, রায়হান, সোনা ওরফে রানা, আবু আয়ান, নাদিম, সামির, শোভা, জয়নাল আবেদীন, আকাশ, আরিফ, আরিফ, আবদুর রহমান, জিহাদ, রাজু হাওলাদার, লিটন, সাব্বির ও রবিউল।