Image description

সরকার সম্প্রতি নয়জন জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিবের চুক্তি বাতিল করেছে। এর আগে আরো তিন সচিবকে নিজ নিজ পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

তবে এসব দপ্তরে এখনো নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর কার্যত দপ্তরপ্রধান ছাড়াই চলছে। এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগেও কয়েক মাস ধরে নেই দপ্তরপ্রধান। সে কারণে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও রদবদল কার্যক্রম পরিচালনায় তৈরি হয়েছে জটিলতা।

এ পরিস্থিতিতে প্রশাসন পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে। একই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়ও দেখা দিয়েছে ধীরগতি।

সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় বর্তমানে মোট ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন ৭৯ জন জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। সম্প্রতি চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল হওয়ায় বর্তমানে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬৬-এ। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব পদে মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে নিয়োগ দেয়। এখনো অন্তত ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব পদ শূন্য রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক এ দপ্তরগুলো বর্তমানে নেতৃত্ব ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাস কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল শুরু হয়েছে। তবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের জন্য উপযুক্ত কর্মকর্তা বাছাই নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সচিব পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে কর্মকর্তাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হলেও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলছে না। আবার যেসব কর্মকর্তার এসিআর ইতিবাচক, তাদের মধ্যেও পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় চূড়ান্ত বিবেচনায় আটকে যাচ্ছেন। ফলে সচিব নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।

 

প্রশাসন সাজানো কিংবা রদবদলের কার্যক্রম পরিচালিত হয় মূলত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি অনুবিভাগ থেকে। মন্ত্রণালয়ের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, এ অনুবিভাগটির নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার হয়ে থাকেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমল, অর্থাৎ গত বছরের অক্টোবর থেকেই উইংটি নেতৃত্বশূন্য। তবে জনপ্রশাসন সচিব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ অনুবিভাগটির কার্যক্রম সরাসরি দেখভাল করছেন বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

চলতি মাসের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকারের পথচলা শুরু। তার একদিন আগেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পান ড. নাসিমুল গনি। আর সরকার গঠনের পরদিন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় এবিএম আব্দুস সাত্তারকে।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক সপ্তাহের মাথায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবসহ (সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন) তিন সচিবকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নিজ পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তারা হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সদ্য সাবেক সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সদ্য সাবেক সচিব রেহানা পারভীন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক সচিব মো. কামাল উদ্দিন।

একই দিন নয় সচিবের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। তারা হলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোখলেস উর রহমান, এসএম আকমল হোসেন, কাইয়ুম আরা বেগম, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক শরীফা খান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মো. সাইদুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের শীষ হায়দার চৌধুরী, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক সিদ্দিক জোবায়ের, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউসুফ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মমতাজ আহমেদ। তাদের মধ্যে মো. সাইদুর রহমান ছাড়া বাকিরা জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

সরকারের এক সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জনপ্রশাসন যেভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল সেখানে সবাই ওই সরকারের অনুগত হতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বর্তমান কর্মকর্তাদের বড় অংশই ওই সরকারকে সার্ভ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে প্রশাসনকে সে জায়গা থেকে বের করতে পারেনি। তারাও নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। এখন নতুন সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ কোনো মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের জন্য সঠিক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে দায়িত্ব দেয়া। এরই মধ্যে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। সে অনুযায়ী কর্মকর্তা বাছাই করলে ভালো ফলাফল আসবে। না হলে সব আগের মতোই চলবে।’

ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনপ্রশাসন পুনর্গঠনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এর প্রধান কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও প্রশাসনকে দক্ষ ও নিরপেক্ষভাবে পুনর্গঠনের পরিবর্তে পছন্দের লোক বসানোর প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্ব আরো দুর্বল হয়েছে। এখন যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটিকে দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামাল দিতে না পারলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। আবারো যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসন সাজানো হয়, তাহলে আগের সমস্যারই পুনরাবৃত্তি হবে।’

কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দায়িত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে, তা অবশ্য সময়ই বলবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসনকে দক্ষতার সঙ্গে পুনর্গঠন করতে না পারলে এর প্রভাব শুধু প্রশাসনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজনীতিতেও পড়বে। দুর্বল ও অদক্ষ প্রশাসন শেষ পর্যন্ত সরকারকেই জনমনে অপ্রিয় করে তুলতে পারে।’

বিএনপি সরকারের সামনে যোগ্য ও সঠিক কর্মকর্তা নির্বাচন করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সাবেক সচিব শামীম আল মামুনও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যোগ্য ও সঠিক কর্মকর্তা নির্বাচন। কারণ আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে আমলাতন্ত্রকে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে আদর্শ আমলাতন্ত্রের চরিত্র তথা নিরপেক্ষতার বৈশিষ্ট্য প্রায় বিলুপ্ত করে দেয়া হয়। ওই সময় নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনকারী সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা কোনো পদোন্নতি না পেয়েই অবসরে গিয়েছেন। বঞ্চনা নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকার যে কমিটি গঠন করেছিল তারাও বঞ্চিতদের প্রতি যথাযথ সুবিচার করতে পারেনি।’

সম্প্রতি যেসব কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, তা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন সাবেক এ সচিব। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতেই অনেক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সমালোচনার বিষয় হয়। দু-একজন ছাড়া কাউকেই খুব কার্যকর ভূমিকায় দেখা যায়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রমে এর প্রভাব লক্ষ করা গেছে, প্রশাসনকে দিশাহীন মনে হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সৎ, দক্ষ ও নির্ভীক কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করা জরুরি। দীর্ঘকাল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় অভ্যস্ত এবং তোষামোদকারী আমলাদের দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব না। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া আমলাদের ফিরিয়ে এনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রমে এর প্রভাবও লক্ষ করা গেছে। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভবও নয়। কেননা সব রাজনৈতিক সরকারই নিজেদের অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেখতে চায়। বিএনপি সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। যদিও এখনো তারা প্রশাসনে বড় ধরনের হাত দেয়নি; কিছু চুক্তি বাতিল করছে, আবার কিছু নতুন চুক্তিও দিচ্ছে।

সরকারের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে তা স্বল্পমেয়াদি হওয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নিয়োগ হলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও কর্মপ্রবাহ ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পুরো প্রশাসনে পড়ে। এতে প্রশাসন অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, দক্ষ ও নিরীহ কর্মকর্তারা নীরবে কাজ করেন, আর অযোগ্য কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই সামনে চলে আসেন। যদি সে প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা কঠিন।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন সচিব মো. এহছানুল হককে ফোন দেয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী ফোনে বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বল্প সময়ে এক-দুই লাইনে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।