দেশে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে বিএনপি, যার বড় প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ারের দর বেড়ে গেছে। বিপরীতে কমেছে জামায়াত নেতাদের কোম্পানির শেয়ার পতনমুখী।
রোববার দিন শেষে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০১ পয়েন্ট বা পৌনে ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে। দিন শেষে এই বাজারে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। গত পাঁচ মাসের ব্যবধানে গতকালই ঢাকার বাজারে সূচক ও লেনদেন সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছে। এর আগে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ ডিএসইএক্স সূচকটি ৫ হাজার ৬২৭ পয়েন্টের সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল। আর একই দিন ঢাকার বাজারে সর্বশেষ ১ হাজার ৪০১ কোটি টাকার সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর গতকাল রোববার ছিল প্রথম কার্যদিবস। নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাবে এদিন লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যায়। ভালো মানের বেশির ভাগ ব্যাংকসহ ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের শীর্ষে ছিল। এ কারণে এসব শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সূচকও। সেই সঙ্গে লেনদেনেও ছিল ভালো গতি।
ঢাকার পুঁজিবাজারে রোববার লেনদেন শুরুর প্রথম ঘণ্টাতেই ডিএসইএক্স সূচকের ১০০ পয়েন্টের বেশি উত্থান দেখা যায়। লেনদেন ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তাতে প্রথম এক ঘণ্টাতেই ডিএসইএক্স সূচকটি আবারও সাড়ে ৫ হাজার পয়েন্টের মাইলফলক ছাড়িয়ে গিয়েছিল, দিন শেষে যা ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে গিয়ে থামে।
রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হওয়া ৩৯৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৬৪টির বা ৯২ শতাংশের দাম বেড়েছে। দাম কমেছে ২৬টির বা ৭ শতাংশের আর অপরিবর্তিত ছিল ৪টির বা ১ শতাংশের দাম। বেশির ভাগ শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিতে এক দিনেই ডিএসইর বাজার মূলধন প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২১ হাজার ২৮২ কোটি টাকায়।
ডিএসইর অন্য সূচকগুলোর মধ্যে বাছাই করা ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচকটি ৮৬ পয়েন্ট বা ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচকটি বেড়েছে ৩০ পয়েন্ট বা পৌনে ৩ শতাংশ।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গতকাল ৪৮৪ পয়েন্ট বা সোয়া ৩ শতাংশ বেড়েছে। সেখানকার বাজারে গতকাল লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ কোটি টাকা। নির্বাচনের আগে সর্বশেষ কার্যদিবস ১০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বাজারে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে নির্বাচনের পরের কার্যদিবসে এসে লেনদেন প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফলের সুস্পষ্ট একটি প্রভাব শেয়ারবাজারে পড়েছে বলে বাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির ভূমিধস জয়ে দলটির নেতা ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মালিকানা বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—তালিকাভুক্ত এমন কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে নির্বাচনী মাঠের প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এমন কোম্পানির শেয়ার দরের পতন হয়েছে।
বাজারের অংশীজনদের মতে, শেয়ারদরের নির্বাচন-পরবর্তী এই উত্থান স্বাভাবিক আচরণ। তবে বাছবিচার ছাড়া রাজনীতি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ারের দরবৃদ্ধি ও দরপতনকে অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক বলে মনে করছেন তারা।
লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষে যেসব কোম্পানি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসন পেয়ে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। আর জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি পেয়েছে আসন। এই বিপুল ব্যবধানের ফলের সুস্পষ্ট প্রভাবে ঢাকার শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা ব্যাংক। ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানি হিসেবে এ শ্রেণিভুক্ত এই ব্যাংকের সাড়ে ৪২ কোটি টাকার সমমূল্যের শেয়ার হাতবদল হয়। আর প্রতিটি শেয়ারের দাম দিনের শুরুতেই সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বা ১ টাকা ৩০ পয়সা বেড়ে হয় ১৪ টাকা ৮০ পয়সা।
বেসরকারি ঢাকা ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও তার পরিবারের সদস্যরা। ব্যাংকটি এতদিন গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছিল।
এতদিন ঢাকা ব্যাংকের পাশাপাশি গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছিল ন্যাশনাল ব্যাংকও। নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবস গতকাল রোববার এই ব্যাংকের শেয়ারেরও সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকটির শেয়ারের দাম ৪০ পয়সা বা ১০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৪ টাকা। ন্যাশনাল ব্যাকের চেয়ারম্যান বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু।
এছাড়া বিএনপির এই ব্যবসায়ী নেতার মালিকানাধীন তালিকাভুক্ত কোম্পানি কে অ্যান্ড কিউ ও দুলামিয়া কটনের শেয়ারের দামও লাফিয়ে বেড়েছে। দুর্বল মানের জেড শ্রেণিভুক্ত দুলামিয়া কটনের শেয়ারের দাম গতকাল প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ বা ৬ টাকা বেড়েছে। আর মাঝারি মানের বি শ্রেণিভুক্ত কে অ্যান্ড কিউর শেয়ারের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ বা ৩৮ টাকা।
বিএনপি নেতাদের মালিকাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান মুন্নু গ্রুপ, যার চেয়ারম্যান আফরোজা খানম মানিকগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। গতকাল শেয়ারবাজারে মুন্নু গ্রুপের সব কটি কোম্পানিরই শেয়ারের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে মুন্নু ফেব্রিকসের প্রতিটি শেয়ারের দাম দিনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বা ২ টাকা ২০ পয়সা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ২৪ টাকায়। দিন শেষে কোম্পানিটির ১৯ কোটি টাকার সমমূল্যের শেয়ারের লেনদেন হয়।
এ ছাড়া মুন্নু সিরামিকসের শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ বা ৭ টাকা ৭০ পয়সা বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ টাকায়। মুন্নু অ্যাগ্রোর প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ বা ২৭ টাকা। যদিও মুন্নু গ্রুপের তিনটি কোম্পানিই মাঝারি মানের কোম্পানি হিসেবে বি শ্রেণিভুক্ত।
অন্যদিকে রোববার জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন হয়েছে। দিনের শুরুতেই দরপতন শুরু হওয়া ব্যাংকটির শেয়ারের দাম ৫ শতাংশ বা প্রায় আড়াই টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ টাকা ৫০ পয়সায়। একইভাবে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট নেতাদের প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারের দাম এদিন ৩ শতাংশ বা ১০ টাকা কমেছে। মানের দিক থেকে ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনা মুন্নু গ্রুপের কোম্পানিগুলোর তুলনায় ভালো। দুটি কোম্পানিই এ শ্রেণিভুক্ত।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শেয়ারের দামের এই উত্থান-পতন অনেকটাই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবে। এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “কোম্পানির বিনিয়োগ হতে হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ব্যবসা, আয়-ব্যয়, মুনাফা ও লভ্যাংশের ওপর ভিত্তি করে। তার বাইরে অন্য কোনো কারণে কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত তা টেকসই হয় না।”
সূচকের প্রভাব বেশি যেসব কোম্পানির
শেয়ারবাজারের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে গতকাল রোববার সূচকের উত্থানে বেশি ভূমিকা ছিল যেসব কোম্পানির, সেগুলো হলো যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, সিটি ব্যাংক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, বেক্সিমকো ফার্মা, লাফার্জহোলসিম সিমেন্ট, গ্রামীণফোন, ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও রেনাটা। এই দশ কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিতে এদিন সম্মিলিতভাবে ডিএসইএক্স সূচকটি বেড়েছে ৭০ পয়েন্টের বেশি। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের সাড়ে ৪ শতাংশ বা সাড়ে ৩ টাকা মূল্যবৃদ্ধিতে সূচক বেড়েছে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ১৪ পয়েন্ট। আর স্কয়ার ফার্মার শেয়ারের ৩ শতাংশ বা ৭ টাকা মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইএক্স সূচকটি বেড়েছে ১৩ পয়েন্টের বেশি।
সূচকের বড় উত্থানের এদিনে ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনার শেয়ারের দরপতনে সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই তিন কোম্পানির শেয়ারের দরপতনে এদিন ডিএসইএক্স সূচকটি ১৯ পয়েন্টের মতো কমেছে।
শীর্ষনিউজ