Image description

বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তার আভাস দেখা দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফাস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘এইচঅ্যান্ডএম’-কে ঘিরে এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকদের একটি অংশের দাবি— সুইডেনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের কয়েকটি বড় সরবরাহকারীর কাছ থেকে অর্ডার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। একইসঙ্গে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ভারতসহ অন্যান্য দেশের দিকে তাদের ঝোঁক বাড়ছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তবে বিষয়টি এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও, সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের লক্ষণ এবং বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন শিল্পে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।

অর্ডার কমার ইঙ্গিত, বাড়ছে উদ্বেগ

শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত এক থেকে দেড় বছরে এইচঅ্যান্ডএম-এর ক্রয় কৌশলে পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে। আগে যেখানে বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতভাবে বড় অর্ডার দেওয়া হতো, এখন সেখানে অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে সীমিত সংখ্যক বড় ও দক্ষ সরবরাহকারীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে।

রফতানিকারকদের দাবি, দেশের ১০টির বেশি বড় পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে  রিদিশা, হেমস, এনএএফএ, ভারটেক্স, স্যান, অ্যাবনি, ফাউনটেইন এবং মুন রেডি উইয়ার্সের মতো সরবরাহকারীর নাম আলোচনায় এসেছে।

একজন শীর্ষ রফতানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এইচঅ্যান্ডএম পুরোপুরি বাংলাদেশ থেকে সরে যাচ্ছে— এমন বলা যাবে না। তবে তারা আগের মতো অনেক কারখানায় অর্ডার ছড়িয়ে দিচ্ছে না। এখন তারা বড়, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহকারীদের ওপর বেশি নির্ভর করছে।” এই পরিবর্তনের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রম ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বৈশ্বিক ক্রেতাদের কৌশল বদল

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের একক কোনও সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক রফতানি ও সরবরাহ কাঠামোর পরিবর্তনের অংশ। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া এবং অনলাইনভিত্তিক নতুন প্রতিযোগী ব্র্যান্ডগুলোর উত্থানের কারণে বড় ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়েছে। এর ফলে তারা ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের দিকে ঝুঁকছে। এইচঅ্যান্ডএম এখন উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবেশগত মান, কার্বন নিঃসরণ কমানো, পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামাল ব্যবহার এবং উৎপাদনের দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে যেসব কারখানা এসব মানদণ্ড পূরণে পিছিয়ে, তারা অর্ডার হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন “কম সরবরাহকারী, বেশি নিয়ন্ত্রণ”— এই নীতিতেই বৈশ্বিক ক্রেতারা এগোচ্ছে।

বাংলাদেশের অবস্থান এখনও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এইচঅ্যান্ডএম-এর অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির মোট রপ্তানি সংগ্রহের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ আসে বাংলাদেশ থেকে।

দেশে বর্তমানে ২০০টির বেশি কারখানা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এইচঅ্যঅন্ডএম-এর সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ থেকে মূলত টি-শার্ট, ডেনিম, নিটওয়্যার, শিশুদের পোশাক এবং সাধারণ ফ্যাশন পণ্য রফতানি হয়। একসময় এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলারের পোশাক সংগ্রহ করত বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

কেন পরিবর্তন হচ্ছে কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে— বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তা ব্যয় হ্রাস, অনলাইনভিত্তিক ফাস্ট ফ্যাশন প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইনে ঝুঁকি কমানোর কৌশল, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর জোর এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করছে। এর অংশ হিসেবে কিছু দেশে দোকান বন্ধ, কর্মী সংখ্যা হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভারতের দিকে ঝোঁক বাড়ছে?

শিল্প-মালিকদের একটি অংশের দাবি, এইচঅ্যান্ডএম এখন ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করছে। বিশেষ করে ম্যানমেইড ফাইবার, সিনথেটিক কাপড় এবং দ্রুত কাঁচামাল সরবরাহ সুবিধার কারণে ভারতকে নতুন বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারত ইতোমধ্যে বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, সরকারি প্রণোদনা এবং শক্তিশালী টেক্সটাইল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবহার করে বিদেশি ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে।

বাংলাদেশি রফতানিকারকদের মতে, এখন অনেক ক্রেতা “চীন প্লাস ওয়ান” কৌশলের পাশাপাশি “বাংলাদেশ প্লাস ভারত” মডেলে যাচ্ছে। অর্থাৎ একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক দেশে উৎপাদন ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সিনথেটিক ও মিশ্র কাপড়ের বাজার দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো মূলত তুলাভিত্তিক উৎপাদনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় চাপ বাড়তে পারে।

নতুন চ্যালেঞ্জ: প্রযুক্তি ও পরিবেশ

বর্তমানে শুধু কম দামে উৎপাদন যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন উৎপাদনের মান, পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এইচঅ্যান্ডএম এখন কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করা। ফলে যেসব কারখানা আধুনিকায়নে পিছিয়ে থাকবে, তারা ধীরে ধীরে অর্ডার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

একজন রফতানিকারক বলেন, “আগে শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই অর্ডার পাওয়া যেত। এখন ক্রেতারা জানতে চায় উৎপাদন কতটা পরিবেশবান্ধব এবং কতটা দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।”

ভূ-রাজনীতি ও কাঁচামাল সংকটের চাপ

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও রফতানি খাতকে প্রভাবিত করছে। ফলে বড় ক্রেতারা এখন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক। ছোট ছোট অর্ডার, দ্রুত ডেলিভারি এবং কম দামে উৎপাদনের চাপ বাড়ছে। এতে কারখানার লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে রফতানি প্রবৃদ্ধিও ধীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য বার্তা

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। দীর্ঘদিন ধরে কম খরচের শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এখন বৈশ্বিক বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন— প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, অটোমেশন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব কারখানা, দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা, শক্তিশালী কাঁচামাল ভিত্তি এবং নতুন ধরনের তন্তু উৎপাদনে বিনিয়োগ। তবে একইসঙ্গে এটিও সত্য যে, বাংলাদেশের শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বিপুল সংখ্যক পরিবেশবান্ধব কারখানা এখনও দেশকে বৈশ্বিক রফতানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি সরে যাবে— এমন সম্ভাবনা কম। বরং তারা ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করছে। সব মিলিয়ে, এইচঅ্যান্ডএমকে ঘিরে তৈরি হওয়া অর্ডার কমার আলোচনা বাংলাদেশের রফতানি খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও এটি সম্পূর্ণ সরে যাওয়ার ইঙ্গিত নয়, তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য এটি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

আগামী দিনে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু কম দামে উৎপাদন নয়, বরং দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং টেকসই উৎপাদনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়াই এখন সময়ের দাবি।