ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ১২ জনের প্রার্থী তালিকা তৈরি করেছে জামায়াতের মহিলা বিভাগ। আগামী ১২ই মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে চায় তারা। এজন্য নবীন-প্রবীণ মিলে ১২ নারী নেত্রীর নামের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে। জামায়াতের নীতিনির্ধারণী ফোরাম যাচাই বাছাই শেষে নারী প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে বলে দলীয় সূত্র জানায়।
সূত্র মতে, আগামী ১২ই মার্চ বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। তার আগেই সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে চায় প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এরই অংশ হিসেবে ১২ নারী নেত্রীর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জামায়াতের দায়িত্বশীল এক নেতা জানিয়েছেন, গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যেসব অঞ্চলে প্রার্থী দিয়ে জামায়াত আসন পায়নি, সেসব অঞ্চল থেকে সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থীদের প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে সংসদের উচ্চকক্ষ এবং আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্যও নারীনেত্রীদের প্রস্তুত করছে দলটি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে ৬৮ আসনে জয় পেয়েছে। প্রতি ছয় সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন প্রাপ্ত হয়। এই অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনের মধ্যে জামায়াত পাবে ১১টি।
সেই হিসেবে জামায়াতের মহিলা বিভাগ ১২ সদস্যের তালিকা দলের আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের কাছে দিয়েছে। দলীয় ফোরামের পরামর্শের ভিত্তিতে তিনি এই তালিকা চূড়ান্ত করবেন।
জামায়াত সূত্রের দাবি, ১২ জনের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য, ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাবেক নেত্রী, গণমাধ্যমে পরিচিত মুখসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নারী নেত্রীরা। তাদের মধ্যে আছেন মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, ছাত্রী সংস্থার সাবেক সভানেত্রী ও জামায়াতের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান ডা. হাবিবা চৌধুরী সুইট, ড. ফেরদৌস আরা বকুল, প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, ডা. আমিনা বেগম, শাহানারা বেগম, বেগম রোকেয়া আনসার, এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী, ছাত্রী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী খোন্দকার আয়েশা বেগম, ছাত্রী সংস্থার আরেক সাবেক সভানেত্রী ডা. হাবিবা আখতার চৌধুরী, সাঈদা রুম্মান, জান্নাতুল কারীম। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নে এই তালিকায় যোগ-বিয়োগ হতে পারে।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জামায়াতের চার নারী সংরক্ষিত আসনে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৬ সালেও দলটির দুই নারী সংরক্ষিত আসনে সদস্য হয়েছিলেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ পর্যন্ত সরাসরি নারী প্রার্থী না দিলেও ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াত মনোনীত ৩৬ জন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
২০০১-০৬ মেয়াদে সংরক্ষিত আসনে জামায়াত মনোনীত সদস্য ছিলেন- জামালপুরের সুলতানা রাজিয়া, জামায়াতের বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমানের স্ত্রী ডা. আমিনা বেগম (সিলেট), রাজশাহী থেকে শাহানারা বেগম ও সাতক্ষীরা থেকে বেগম রোকেয়া আনসার। ত্রয়োদশ সংসদের সংরক্ষিত আসনে তাদের মধ্য থেকে অন্তত দু’জন নারী প্রার্থী আছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক নুরুন্নিসা সিদ্দিকা রয়েছেন। তিনি বলেন, নবীন-প্রবীণ এবং তৃণমূলের সমন্বয়ে আমরা নারী প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করেছি। তবে সেটা কোনোভাবেই চূড়ান্ত নয়। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সেটা যাচাই-বাছাই করবেন। সেক্ষেত্রে প্রস্তাবের বাইরের নারী নেত্রীদের মনোনয়ন দেয়ার এখতিয়ার ফোরামের আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ইতিপূর্বে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জামায়াতের নারী নেত্রীদের তেমন দেখা যেতো না। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পট পরিবর্তনের পর দলটির নারী শাখা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করেছে। গণমাধ্যমেও হাজির হয়েছেন অনেকেই। এর মধ্যে ছাত্রী সংস্থার সাবেক সভানেত্রী ও জামায়াতের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান ডা. হাবিবা চৌধুরী সুইট, ড. ফেরদৌস আরা বকুল, প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, সাবিকুন্নাহার মুন্নির নাম উল্লেখযোগ্য। জামায়াতের বিভিন্ন সভা সেমিনার এবং গণমাধ্যমের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে তাদের।
সূত্রের দাবি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দের স্ত্রী সাবিকুন্নাহার মুন্নী জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তাকে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। টকশোতে সাবলীল বক্তৃতা করে আলোচনায় আসা জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজের নামও সদস্য তালিকায় আছেন বলে জানা যায়। মারদিয়া রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
সদ্য পুনর্গঠিত জামায়াতের ৮৮ সদস্যের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে যুক্ত হয়েছেন ২১ নারী। এই নারী সদস্যদের বেশির ভাগ জামায়াতের মহিলা বিভাগের এবং ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে ছিলেন। এর মধ্যে দলের আমীরসহ দায়িত্বশীল নেতাদের স্ত্রী-কন্যাও রয়েছেন।
কর্মপরিষদের সদস্য রয়েছেন ছাত্রী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী খোন্দকার আয়েশা বেগম। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর মীর কাসেম আলীর স্ত্রী। ছাত্রী সংস্থার আরেক সাবেক সভানেত্রী ডা. হাবিবা আখতার চৌধুরী দলটির নায়েবে আমীর ডা.সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের স্ত্রী। ছাত্রী সংস্থার সাবেক সভানেত্রী নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, সাঈদা রুম্মান, নাজমুন নাহারও আছেন কর্মপরিষদে।
জামায়াত আমীর শফিকুর রহমানের স্ত্রী ডা. আমিনা বেগমও পরিষদের সদস্য। নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দের স্ত্রী সাবিকুন্নাহার মুন্নী এবং কেন্দ্রীয় নেতা ফখরুদ্দিন মানিকের স্ত্রী জান্নাতুল কারীমও রয়েছে ২১ সদস্যের কর্মপরিষদে।
মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, দল থেকে যারা সংসদ সদস্য আছেন, তাদের পরিবারের বাইরে গিয়ে যে এলাকায় সংসদ সদস্য কম পেয়েছি অথবা সংসদ সদস্য কেউ হতে পারেননি, সংসদে সেসব জায়গার নারী প্রতিনিধিদের প্রধান্য দেয়া হবে। এতে দেশের সব অঞ্চল থেকে জামায়াতের প্রতিনিধি সংসদে থাকার সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সংরক্ষিত সদস্য হিসেবে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রস্তাবিত নারী নেত্রীর প্রভাব, তার পেশা, স্থানীয় পর্যায়ে আগে নির্বাচন করে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এমন নারীকে তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, ‘স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি, বুদ্ধিমত্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও কথার বলার যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।