পাবনায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পোলিং এজেন্ট হওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক ছাত্রীর বাড়িতে হামলা করেছে ধানের শীষের নেতাকর্মীরা। ওই ছাত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিলে পরদিন সকালে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। অপরদিকে ঝিনাইদহে আরেক রাবি ছাত্রীর পরিবারের সদস্যদের ‘উলঙ্গ করে উপভোগ’ করার হুমকির অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে পাবনা সদরের আতাইকুলা ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের মৌগ্রামে ওই ছাত্রীর বাড়িতে হামলা হয়। ভুক্তভোগী ছাত্রী রাবির চারুকলা অনুষদভুক্ত একটি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ ইকবাল হোসাইনের পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার বাবা আবুল হোসেন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার।
অপরদিকে হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া লাল মিয়া ও তার দুই ছেলে সম্প্রতি বিএনপির ধানের শীষের প্রতীকের প্রচারণায় যোগ দিয়েছেন। এর আগে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাল মিয়ার ভাই আহম্মদ নকশালপন্থী সর্বহারা পার্টির সঙ্গে জড়িত।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই রাবি ছাত্রী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি জামায়াতের এজেন্ট হয়েছিলাম। এছাড়া ছাত্রী সংস্থার সাথেও জড়িত আছি। ওই সুবাদে যখন ধানের শীষ বিজয়ী হল, তখন রাত ১১টার দিকে বিজয় মিছিল নিয়ে গুটিকয়েক সমর্থক আমার বাড়ির সামনে এসে কয়েকটা ককটেল বিস্ফোরণ করে। আমাকে, আমার মা-বোন তুলে যা ইচ্ছা তাই বলে গালাগালি করল। বাবা ছাড়া আমাদের পরিবারে পুরুষ সদস্য নাই, আমার দুইটা ভাই ছিল মারা গেছে, এখন আমার বাবাই আছে শুধু। বাবাকে হুমকি দিল যে তাকে কুপিয়ে মারবে আর আমাদের বাসায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেবে। এরকম নানান হুমকি দেওয়ায় ভয় পেয়ে আমরা পরের দিন সকালে নানাবাড়ি চলে আসছি।
তিনি বলেন, যেহেতু আমার ফ্যামিলিতে বাবা ছাড়া কেউ নাই, হঠাৎ করে যদি কিছু একটা হয়ে যায়— ওটা তো উঠে আসবে না। তাই নিরাপত্তার ভয়ে সিরাজগঞ্জে নানাবাড়ি আমরা চলে আসছি। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের সাথেও কথা হয়েছে। কিন্তু তারা বললেন যে যেহেতু ক্ষমতা ওরা পেয়ে গেছে, সন্ত্রাস করছে, তো আপনারা একটু ধৈর্য্য ধরেন, একটু সেফে থাকেন।
ভুক্তভোগী ছাত্রী বলেন, আমি তো বাবাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছি। আমার বাবা বাসায় গেলে ওরা এটাক করবে, আমি জানি এটা। আমার একটা ছোট বোন আছে, আর আম্মু আছে। আমার ভাই দুটা বাচ্চা রেখে মারা গেছে। ওরা ছোট ছোট। ভাবি বাবার বাড়ি থাকে মেয়েটাকে নিয়ে। আর ছেলেটা আমাদের সাথে, গ্রামের একটা হাফিজিয়া মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছে। আমার বাবা দুই বেলা ভাত দিয়ে আসে, ও রাতে ওখানেই থাকে। ফ্যামিলির ওপর যদি কোন বিপর্যয় চলে আসে, এখন আমার পৃথিবীতে আর কেউ নাই বাবা ছাড়া— এরকম একটা অবস্থা। ওই দুই-তিনটা বাচ্চা, আমার বোন, সবাই একদম শেষ হয়ে।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পাবনা সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এ কে এম মুসা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, তিনি ঘটনা সম্পর্কে অবগত নন। তিনি বলেন, আমি এরকম কিছু শুনিনি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখব। হয়ে থাকলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামিরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা এরকম কোনো অভিযোগ পাইনি। সেখানে ফোর্স পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিব।
দলবল নিয়ে ‘উলঙ্গ করে উপভোগে’র হুমকি
ঝিনাইদহ-২ (সদর ও হরিণাকুণ্ডু) আসনে জামায়াতের প্রার্থী আলী আজম মো. আবু বক্করের জয়ের পর হরিণাকুণ্ডু উপজেলার তাহেরহুদা ইউনিয়ন জামায়াতের আমিরের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। তার স্ত্রী মহিলা জামায়াতের থানা শাখার সহকারী সেক্রেটারি। আর মেয়ে সমাজবিজ্ঞান অনুষদভুক্ত একটি বিভাগের ছাত্রী। আর হুমকিদাতা যুবক মুক্ত স্থানীয় বিএনপিকর্মী। হুমকি দেওয়ার সময়ের একটি রেকর্ড দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের হাতে এসেছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই নারী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের অরিজিনাল বাড়ি মহেশপুর, এখানে চাকরিসূত্রে থাকি। এ বিষয়টিকে নিয়ে নির্বাচনের আগে থেকেই আমাদেরকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে গতকাল সন্ধ্যার সময় আমার বাসার সামনে ২০-২৫ জন লোক আসছে। তারা বাড়িঘর ভাঙার হুমকি দেয়। পরে আবার ফিরে এসে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলে যে আমরা জাতীয়তাবাদী সরকার গঠন করতে যাচ্ছি, কিন্তু দেশে যেমন কিছু রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে তেমন আমাদের গ্রামেও রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে, তারা মা-বোনদের কাছ থেকে ইয়ানতের নামে চাঁদা নিয়ে আসছে। এরকম বিভিন্ন কথাবার্তা তারা বলছিল। এক পর্যায়ে বলে যে আমাকে বাইরে বের করে নিয়ে উপভোগ করবে।
তিনি বলেন, সে সময় আমার হাজবেন্ড বাসায় ছিল না। পরে আমি তাকে জানালে উনি সাথে সাথে থানা আমিরকে জানান। পরে নেতৃবৃন্দ এবং ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ আসেন। যারা বাসায় আসছিল, তাদের নিয়ে বসেন। প্রথমে তারা অস্বীকার যায়, পরে বিষয়টা স্বীকার করে ক্ষমা চায়। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে এসে আবার আমাকে চাকরি থেকে বাদ দিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের স্থানীয় সুপারভাইজারকে কল দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে জেলা ও উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। জেলার ৪টি আসনের ৩টিতেই পরাজিত হওয়ার পর তাদের কয়েকজনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার মুঠোফোনে কল গেলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ ছাড়া ঘটনা সম্পর্কে কিছু শোনেননি বলে জানিয়েছেন হরিণাকুণ্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া হাসান। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হতে পারে। আমার নলেজে নাই।