ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী তিন রাজনীতিকের জীবনযাত্রা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। দীর্ঘ কারাবাস, মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পর মুক্তি সব মিলিয়ে তারা এখন জাতীয় সংসদের সদস্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি দেশের ক্ষমতার রদবদল ও জনমতের পরিবর্তনের একটি প্রতীকী প্রতিফলন।
দীর্ঘ কারাবাস থেকে মুক্তি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। এর পরপরই বিভিন্ন উচ্চপ্রোফাইল মামলার আইনি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে এবং বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দি খালাস পান। তাদের মধ্যে ছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টু এবং এটিএম আজহারুল ইসলাম।
তিনজনই পূর্ববর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন এবং বছরের পর বছর কারাগারে ছিলেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর আপিল ও পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে তারা খালাস পান এবং মুক্তি লাভ করেন।
বাবর: ১৮ বছরের কারাবাস থেকে নির্বাচনি বিজয়
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর গ্রেপ্তার হন ২০০৭ সালে। দীর্ঘ ১৮ বছর কারাগারে থাকার পর আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পান তিনি।
মুক্তির পর নিজ নির্বাচনী এলাকা নেত্রকোনায় সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-৪ (মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরি) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হন। তার প্রত্যাবর্তনকে বিএনপি সমর্থকরা ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরছেন।
পিন্টু: টাঙ্গাইলে বড় ব্যবধানে জয়
একই মামলায় দণ্ডিত আরেক বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু ১৭ বছরের কারাজীবন শেষে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুক্তি পান। মুক্তির পর তিনি টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে নির্বাচন করেন। প্রায় দুই লাখ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন তিনি।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘ কারাবাস তার রাজনৈতিক পরিচিতিকে আরও দৃঢ় করেছে এবং সহানুভূতিশীল ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন তিনি।
আজহার: বিতর্কিত মামলার আসামি থেকে সংসদ সদস্য
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম ২০১২ সাল থেকে কারাবন্দি ছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল। সমর্থকদের দাবি ছিল, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ২০২৪ সালের ২৮ মে তিনি মুক্তি পান।
রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি অংশ তার প্রতি সমর্থন জানায় বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মত।
রাজনৈতিক বার্তা
এই তিন নেতার নির্বাচনী বিজয় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন কারাবন্দি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেতাদের জনগণ ভোটের মাধ্যমে সংসদে পাঠানো এটি একদিকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন, অন্যদিকে ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত বিজয় নয়; বরং দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত। তবে একই সঙ্গে অতীতের সহিংসতা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইনের শাসন নিয়ে বিতর্কও আবার সামনে আসতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তাদের ভূমিকা এখন কতটা কার্যকর হয় সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।