জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়েছে এক বছরও হয়নি। দল গোছানোর আগেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে দলটি। এত অল্প সময়ে দল গঠন, নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া এবং প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয় প্রার্থীর জয় লাভ দেশের রাজনীতিতে নজিরবিহীন ঘটনা।
প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বেশ কিছু আসনে জয় লাভ করার মধ্য দিয়ে দেশের তৃতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে হাজির হয়েছে এনসিপি। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া জুলাই শক্তি এনসিপির নির্বাচনি রাজনীতিতে এমন উত্থান নতুন বন্দোবস্তের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় দেড় যুগ পর বৃহস্পতিবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের অন্যতম শরিক হিসেবে অংশ নেয় এনসিপি। দলটির প্রার্থীরা ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ২৭টি আসনে একক প্রার্থী ছিল, বাকি তিনটি আসনে জোটের শরিক দলের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ছয়টি আসনে জয়ী হন এনসিপির প্রার্থীরা। ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন আর বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। এ নির্বাচনে দলীয় আসনের হিসাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এনসিপি।
শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচিত হওয়া এনসিপির প্রার্থীরা হলেন— ঢাকা-১১ আসনে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, রংপুর-৪ আসনে সদস্য সচিব আখতার হোসেন, কুমিল্লা-৪ আসনে দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, নোয়াখালী-৬ আসনে সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ, কুড়িগ্রাম-২ আসনে যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল-আমিন।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, নাহিদ ইসলাম ৯৩ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৩৩ ভোট। ফলে দুই হাজার ৩৯ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন নাহিদ। আখতার হোসেন পেয়েছেন এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন এক লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট। ফলে ৯ হাজার ৪০২ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন আখতার। হাসনাত আবদুল্লাহ পেয়েছেন এক লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদের জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৮৫ ভোট। ফলে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৯৮ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন হাসনাত। আব্দুল হান্নান মাসউদ পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৯৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহবুবের রহমান পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২১ ভোট। ফলে ২৭ হাজার ৮৭৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন হান্নান মাসউদ। আতিক মুজাহিদ এক লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৯ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ পেয়েছেন এক লাখ ৭০ হাজার ৩৩৫ ভোট। ফলে আট হাজার ৫৩৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন আতিক। আব্দুল্লাহ আল আমিন এক লাখ ছয় হাজার ১৭১ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মনির হোসেন কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। ফলে ২৫ হাজার ৫৫২ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন আল-আমিন।
এনসিপি প্রার্থীদের পরাজিত হওয়া আসনগুলোর মধ্যে অনেকগুলো আসনে দলটির প্রার্থীরা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। এসব আসনে বিজয়ী হতে না পারলেও অল্প ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন এনসিপির প্রার্থীরা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ৫১ হাজার ৫৭২ ভোট পেয়ে বিএনপি প্রার্থীর কাছে চার হাজার ৯৮০ ভোটে হেরেছেন। দিনাজপুর-৫ আসনে এনসিপির ডা. আব্দুল আহাদ এক লাখ ১০ হাজার ১৯৫ ভোট পেয়ে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে চার হাজার ২৮৯ ভোটে হেরেছেন। পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এক লাখ ৬৮ হাজার ৪৯টি ভোট পেয়ে বিএনপি প্রার্থীর কাছে আট হাজার ১২০ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।
আবার অনেকগুলো আসনে বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে এনসিপি প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৩০ থেকে ৫০ হাজার হলেও বিপুলসংখ্যক ভোট পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব এক লাখ ১১ হাজার ২৯৭ ভোট পেয়ে প্রায় ৩৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীর কাছে হেরেছেন। ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন ৫৩ হাজার ৪৬০ ভোট পেয়ে ৫৭ হাজার ৭৫২ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীর কাছে হেরেছেন। এ আসনে সাবেক এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। গাজীপুর-২ আসনে এনসিপির প্রার্থী আলী নাছের খান এক লাখ ৪০ হাজার ৯৫০ ভোট পেয়ে বিএনপি প্রার্থীর কাছে ৪৭ হাজার ৬৫৬ ভোটে হেরেছেন। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এনসিপির এসএম সাইফ মোস্তাফিজ এক লাখ তিন হাজার ৮৮৪ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থীর কাছে ৬৭ হাজার ৬২৪ ভোটে হেরেছেন।
ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হলেও নির্বাচনের ফলাফল ‘টেম্পারিং’-এর চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ভোট শেষে বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, বিভিন্ন আসনে ফলাফল টেম্পারিংয়ের চেষ্টা চলছে। কিছু আসনে বিএনপির প্রার্থীরা হেরে যাচ্ছিলেন এবং কয়েকটি আসনে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা জয়ের দিকে ছিলেন। তখন থেকেই ফলাফল নিয়ে অসংলগ্নতা দেখা দিতে শুরু করে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-তরুণদের একটি বড় অংশ প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করে। পরে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে আত্মপ্রকাশ করে। পরে নির্বাচনের মাসখানেক আগে এসে ১১ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্ত হয় দলটি।