ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন সকালে রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে যান ঢাকা-৮ আসনের জামায়াত জোটের প্রার্থী এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি ভোট কেন্দ্রে প্রবেশের পর পরই তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কর্মী-সমর্থকরাও সেখানে অবস্থান নেন। মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। বন্ধ করে দেয়া হয় কেন্দ্রের গেট। অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এ প্রার্থী। তবে মিনিট বিশেকের মধ্যে সেনাবাহিনী ওই কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। কোনো রকম সংঘাত-সহিংসতা ছাড়াই সেখান থেকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে বের করে আনেন সেনাসদস্যরা। শুধু এ কেন্দ্রে নয়, সারা দেশেই নির্বাচনের দিন সংঘাত-সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সশস্ত্র বাহিনী। গত তিন-চারটি নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এবারের নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ-নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করে সেসব ছাপিয়ে পেশাদারত্বের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী। গণতান্ত্রিক উত্তরণের এ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা তাদের নতুন ভাবমূর্তি তৈরি করল।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হকের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেখানেও দ্রুত ও দক্ষ হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় সেনাবাহিনী। ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, যশোর, বাগেরহাট, ফরিদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভোট কেন্দ্রে সেনাসদস্যদের হস্তক্ষেপে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সিলেটের কয়েকটি কেন্দ্রেও উত্তেজনা দেখা দিলে সেনাবাহিনী সেখানে ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়েছে।
সব মিলিয়ে সারা দেশে ভোটের দিনের নিরাপত্তায় কার্যকর ও পেশাদারভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের। বিশেষ করে সব জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের জন্য পক্ষপাতহীন এবং ভোটারদের জন্য ভয়ভীতিহীন নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকাকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচক হিসেবে মন্তব্য করেছেন। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের অনেক মন্তব্য দেখা যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩, চৌকিদার-দফাদারের ৪৫ হাজার ৮২০ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী আমলের গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে যে ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল, এবারের নির্বাচনে পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষ ভূমিকার মধ্য দিয়ে সেগুলোর অবসান হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গত কয়েক বছরের আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে বাহিনীটি নিজেদের ভূমিকা ও ভাবমূর্তি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। দেশের এ সন্ধিক্ষণে সেনাবাহিনীর পেশাদার ভূমিকা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে। এ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন ছিল সেনাবাহিনীর জন্য এক ধরনের ‘রিহ্যাবিলিটেশন মোমেন্ট’। সংশোধিত আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সেনাবাহিনী এবার কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। এর মাধ্যমে জনআস্থার জায়গায় নিজেদের ভাবমূর্তি নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছেন সেনাসদস্যরা।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত কয়েকটি নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বা তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। আবার এটাও ঠিক যে সেনাবাহিনীকে যেভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল বা দায়িত্ব পালনের যে পরিধি ছিল, সেটার মধ্যে থেকেই তারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা, দায়িত্বের পরিধি, বিচারিক ক্ষমতা এবং সদস্য সংখ্যা—সবকিছুতেই নতুনত্ব ছিল। তারা পরিপূর্ণ পেশাদারত্ব নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। আমাদের সেনাবাহিনী তাদের কাজের মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক মর্যাদা কিংবা অবস্থান তৈরি করেছে। দেশের নির্বাচন বা রাজনৈতিক কোনো সংকটে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিলে সেনাসদস্যরা যে পেশাদারত্ব বজায় রেখে তা সম্পন্ন করতে পারেন এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেটাই প্রমাণ হয়েছে।’
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ওই বছর আরপিও সংশোধন করা হয়। সে সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে নির্বাচনের সময় সশস্ত্র বাহিনী শুধু সহায়ক শক্তি হিসেবে নয়, বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবেও নির্দিষ্ট ক্ষমতা পায়। তবে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আরপিওতে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার আরপিও সংশোধন করে আবারো সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে।
এর আগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা মোতায়েন থাকলেও সেসব নির্বাচনে কোথাও কোথাও অনিয়মের দৃশ্যমান অভিযোগ উঠলেও সে সময় তাদের ভূমিকা ছিল মূলত নিষ্ক্রিয়। আরো পেছনে গেলে ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক আছে। সেনা-সমর্থিত এক-এগারো সরকারের নেতৃত্বে সে নির্বাচনে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সেনা সদর দৃঢ়ভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের ঘোষণা দেয়। প্রয়োজনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন অনুযায়ী বল প্রয়োগ করার ঘোষণাও আসে নির্বাচনের