Image description

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আপনারা জানেন পাঁচ দিন ধরে আমার ওপর ধারাবাহিকভাবে মিসাইল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আমার ওপর মিসাইল মারা হচ্ছে এক্স আইডি হ্যাক করে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় নওগাঁ শহরের এটিএম মাঠে জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলটির আমির এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘যারা এ দেশের জনগণের সরকার চায় না, যারা দলীয় পারিবারিক গোষ্ঠীতান্ত্রিক সরকার চায়, যারা এ দেশকে গোলাম বানিয়ে রাখতে চায়, তারা আমার ওপর এই মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। আমার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই কাণ্ড যারা ঘটিয়েছে, এরই মধ্যে আমাদের সাইবার টিম তাদের নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। প্রধান কালপ্রিট পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু আফসোস—একসঙ্গে বহুদিন মজলুম ছিলাম, রাজপথে একসঙ্গে হাতে হাত রেখে লড়াই সংগ্রাম করেছি, দেশবাসীর সেবা করার চেষ্টা করেছি, আমরা পরস্পরের বন্ধু ছিলাম, আজকে সেই দলের ভাইয়েরাও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘৫ তারিখের (৫ আগস্ট) পর হয়তো আমাদের রাস্তা আলাদা হয়ে গিয়েছে। আমরা ওটা চাচ্ছি না, আমরা একত্রিত ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চাচ্ছি। এজন্য আমার পুরোনো বন্ধুরা যারা এই মিসাইল নিক্ষেপে শরিক হয়েছেন, আজ আপনাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আল্লাহ যেন তাদের ক্ষমা করে দেন।’

দুর্নীতি ও লুটপাটের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘গত ৫৪ বছরে এই প্রিয় বাংলাদেশ বারবার সুযোগ পেয়েছে। যারা শাসন ক্ষমতায় এসেছেন, তারা নিজেরা ক্ষমতাবান হয়েছেন। কিন্তু জনগণের ক্ষমতা তারা বৃদ্ধি করেননি। তারা জনগণের পকেট কেটে নিজেদের কপাল বড় করেছেন। ক্ষমতায় থাকা দলগুলো দেশের ভাগ্য বদলায়নি, বরং জনগণের অর্থ লুট করে নিজেদের ভাগ্য বদলেছে। ব্যাংক লুট, বীমা ধ্বংস, শেয়ারবাজার ধ্বংস ও মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই লুট করা টাকা দেশে রাখার সৎ সাহস ছিল না বলে বিদেশে পাচার করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এই টাকা কিন্তু জনগণের। তবে আমরা কথা দিচ্ছি, সুযোগ পেলে আর কাউকে লুট করতে দেওয়া হবে না। লুট করা টাকা নিয়ে বিদেশে কাউকে শান্তিতে থাকতে দেব না। হাতটা আস্তে করে মুখ দিয়ে পেটের ভেতরে ঢুকাইয়া ওই টাকাগুলো বের করে আনা হবে। যেগুলো যুক্ত হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। সেই টাকা থেকে দেশের পিছিয়ে পড়া এলাকায় করা হবে উন্নয়ন।’

যুবসমাজকে উদ্দেশ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘জুলাইয়ে যেসব তরুণ-তরুণী রাস্তায় লড়াই করেছিল, তারা কিন্তু বেকার ভাতার দাবি করেনি। অথচ আজ বেকার ভাতা দেওয়ার প্রশ্ন উঠছে। তবে আমরা বেকার ভাতা দিতে চাই না, আমরা শিক্ষিত যুবকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ দিতে চাই। কাজ করে দেশ বদলে দিতে হবে।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘মায়েদের ঘরে ও কর্মস্থলে সব জায়গায় চলাচলের জন্য মর্যাদা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। কোনো জালিম সাহস করবে না নারীদের প্রতি চোখ তুলে তাকাতে।’

এই দেশ শুধু মুসলমানের নয়; এই দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাতি মিলে আমাদের এই দেশ বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘অথচ আমাদের যুগ যুগ ধরে পরস্পরের মুখোমুখি করা হয়েছে। কিন্তু আমরা ঘোষণা দিয়েছি বাংলাদেশে কোনো মেজরিটি, মাইনরিটি মানব না। এই দেশে যারা বাস করেন, তারা সবাই এই দেশেরই নাগরিক। আর কোনো বৈষম্য চলবে না।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘চাঁদাবাজি আমরা করি না, কাউকে করতেও দেব না। দুর্নীতি পছন্দ করি না, বগলের নিচে দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় দেব না। ব্যাংক ডাকাতি করি না, কোনো ব্যাংক ডাকাতির সঙ্গে আমাদের আপস হবে না। নিরীহ মানুষকে কষ্ট ও জুলুম করার জন্য যারা মামলা বাণিজ্য করেছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’

জেলা জামায়াতের আমির ও নওগাঁ-৪ আসনের দলীয় প্রার্থী খ ম আব্দুর রাকিবের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, ডাকসুর সাবেক জিএস এসএম ফরহাদ, নওগাঁ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও নওগাঁ সদর-৫ আসনের প্রার্থী আবু সাদাত মো. সায়েম, নওগাঁ-১ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম, নওগাঁ-২ আসনের প্রার্থী এনামুল হক, নওগাঁ-৩ আসনের মাহফুজুর রহমান, নওগাঁ-৬ আসনের প্রার্থী খবিরুল ইসলাম এবং জুলাই যোদ্ধা ফিরোজ হোসেন।

কোনো গোষ্ঠীতান্ত্রিক সরকার নয়, আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এই দেশে রাজার ছেলে রাজা হবে, বংশানুক্রমিক পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। রাজনীতি হবে দেশপ্রেমের প্রমাণের মাধ্যমে। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি ও ভয়ের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য। ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা কোনো দলীয় সরকার চাই না। কোনো পরিবারতান্ত্রিক বা গোষ্ঠীতান্ত্রিক সরকারও চাই না। আমরা চাই বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।’

গতকাল বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ দেশে কোনো আধিপত্যবাদী রাজনীতি আর চলবে না। আমাদের প্রতিবেশীসহ সারা দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক থাকবে। সেই সম্পর্ক হবে সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে। অমর্যাদাকর কোনো সম্পর্ক আমরা কোনো দেশের সঙ্গে চাই না। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই।’

উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘যাদের অতীতেও খাসলত খারাপ ছিল, এখনো যারা লোভ সামলাতে পারেনি, সেই বিড়ালের হাতে গোশত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেবেন? এরা রাষ্ট্রের জনগণের মান এবং ইজ্জতের নিরাপত্তা এখনই দিচ্ছে না, তখনো দেবে না। আফসোস, তারাও মজলুম ছিলেন, কেন যে এখন বদলে গেলেন, বুঝতে পারলাম না। এমন বিভিন্ন জায়গার দখলদারিত্ব নিতে গিয়ে নিজেদেরই ২৩৪ জন শেষ। এখন আমাদের খুন করা শুরু হয়েছে, আমাদের এখন গালি দেওয়া শুরু হয়েছে। যাদের মানুষ মারা গেল, যারা চাঁদাবাজি করে না, যারা কাউকে কষ্ট দেয় না, যারা দুর্নীতি করে না, যারা মামলা বাণিজ্য করে না, যারা বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষকে হয়রানি করে না, তাদের এখন বলা হচ্ছে জালেম।’

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগরী জামায়াতের আমির ড. মাওলানা কেরামত আলী। মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডলের সঞ্চালনায় জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মজিবুর রহমান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু, রাজশাহী-২ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, রাজশাহী-৩ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী-৪ আসনের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী সরদার, রাজশাহী-৫ আসনের প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান, রাজশাহী-৬ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ নাজমুল হক প্রমুখ।

আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই: ‘জুলাই যোদ্ধারা সেদিন রাস্তায় নেমে পড়েছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’—আমরা সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার চাই। তার মানে, ন্যায়বিচার নেই। সেই ন্যায়বিচার আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই ইনশাআল্লাহ। রাজার জন্য যে বিচার, সবার জন্য সেই বিচার।’

গতকাল চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় এসব কথা বলেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘৫৪ বছরের অপশাসন দেখতে দেখতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার থেকে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি চায়, পরিবর্তন চায়। পুরোনো বন্দোবস্ত আর দেখতে চায় না।’

এ সময় জামায়াত আমির চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী কেরামত আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী মু. মিজানুর রহমান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী নুরুল ইসলামের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।

জেলা জামায়াতের আমির আবুজার গিফারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন তিন আসনের প্রার্থী ছাড়াও জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, চাকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি প্রমুখ।

সাম্যের ভিত্তিতে দেশ গড়ে তোলা হবে: জামায়াতের কোনো নেতাকর্মীরা নির্বাচিত হলে চিকিৎসা নেবে না মন্তব্য করে জামায়াতের আমির বলেন, একটি দল বেকার যুবকদের অপমান করতে চায়। তারা তাদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে চায়। আমরা সরকার গঠন করলে যার যার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির ব্যবস্থা করব। সাম্যের ভিত্তিতে দেশ গড়ে তোলা হবে।

গতকাল বিকেলে নাটোরের নবাব সিরাজ উদ দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। জেলা জামায়াতের ড. মীর নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য দেন নাটোরের চারটি আসনে ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য প্রার্থীরা।

নিজেরা দুর্নীতি করব না, কোনো দুর্নীতিবাজকেও প্রশ্রয় দেব না: শফিকুর রহমান বলেন, আসন্ন নির্বাচনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের মধ্যে কোনো ব্যাংক ডাকাত, চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি বা মামলাবাজ নেই। আমরা নিজেরা দুর্নীতি করব না, কোনো দুর্নীতিবাজকেও প্রশ্রয় দেব না।

গতকাল দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই নিরাপদ থাকবে। মায়েরা ঘরে, রাস্তায় ও কর্মস্থলে সম্মান ও নিরাপত্তা পাবে। শিক্ষাব্যবস্থা হবে দেশ গড়ার মতো শক্তিশালী, যুবসমাজকে বেকার ভাতার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না।’

জনসভায় রাজশাহী-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের হাতে প্রতীক তুলে দেন শফিকুর রহমান। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল খালেক।