Image description
লাল পাসপোর্ট সমর্পণে সরকারের দ্বৈতনীতি

পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বাহারুল আলম কূটনৈতিক মর্যাদার (লাল) পাসপোর্ট বদল করে সাধারণ পাসপোর্ট নিতে চান। সম্প্রতি তিনি সরকারি পাসপোর্ট সমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে খোদ আইজিপির পাসপোর্ট সমর্পণের এ খবরে প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ ৮ মাস বাকি থাকতে কেন তিনি এখনই সাধারণ পাসপোর্ট নিতে চান তা নিয়ে সচিবালয়সহ পুলিশ সদর দপ্তরেও নানা আলোচনা ডালপালা মেলছে। একই প্রশ্ন ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে এভাবে লাল পাসপোর্ট সমর্পণ করতে যাওয়া সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার বিষয়ে।

এদিকে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন প্রাপ্তির বিধিনিষেধ ছাড়াই খুব সহজে সরকার সংশ্লিষ্টরা যাতে লাল পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্ট নিতে পারেন সেজন্য সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পূর্বের এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সংশোধন করে স্পষ্টীকরণের নামে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেখানে এ সরকারের আমলে ইতঃপূর্বে জারি করা বিধিনিষেধ সাবেক সরকারের কূটনৈতিক পাসপোর্টের জন্য বহাল রেখে বর্তমান সরকারের জন্য শিথিল করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সদস্য তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেন। ইতোমধ্যে একাধিক উপদেষ্টা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সাধারণ পাসপোর্টও হাতে পেয়েছেন। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার সাধারণ পাসপোর্ট আবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সূত্র জানায়, বাহারুল আলম নিজেই তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য পত্র দেন। এ বিষয়ে অনাপত্তি (এনওসি) চেয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর চিঠি দিয়েছেন। এতে বলা হয়-‘আমি বাহারুল আলম ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ বাংলাদেশ, আমার ব্যবহৃত কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণপূর্বক সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। বর্ণিত কূটনৈতিক পাসপোর্টের পরিবর্তে সাধারণ পাসপোর্ট প্রাপ্তির জন্য অনাপত্তি সনদ প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো।’

রক্তাক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া বিশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি বাহারুল আলমকে অবসর থেকে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর তাকে পুলিশ প্রধান হিসাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছর ২০ নভেম্বর পর্যন্ত তার চাকরির মেয়াদ রয়েছে। এর আগে ৭ আগস্ট অতিরিক্ত আইজিপি মইনুল ইসলাম ৩০তম আইজিপি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুক্তির বর্ধিত মেয়াদ পরবর্তী নির্বাচিত সরকার বাতিল না করলে বাহারুল আলমের আরও ৮ মাস স্বপদে বহাল থাকার কথা। অথচ মেয়াদপূর্তির অনেক আগে পুলিশ প্রধানের সরকারি পাসপোর্ট সমর্পণের খবরে স্বাভাবিকভাবে নানা ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরের কাছে এমন আশঙ্কা করেন, নির্বাচনের পরপরই তিনিও দেশ ছাড়তে পারেন। কেননা, নির্বাচনের আগেই তাকে সরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক দল থেকে জোর দাবি তোলা হয়। তবে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আনুকূল্যে নির্বাচন পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে সৃষ্ট এই প্রেক্ষাপটে আইজিপির পাসপোর্ট সমপর্ণের একটি বিশেষ যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

এদিকে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে বৃহস্পতিবার আইজিপির হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি পালটা প্রশ্ন করে লেখেন ‘কি প্রশ্ন উঠেছে।’ এরপর প্রতিবেদক জানতে চান, ‘অনেকে বলছেন আপনি হয়তো নির্বাচনের পর তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়তে পারেন। এ কারণে সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে রাখছেন।’ তবে পরে তিনি আর কোনো প্রত্যুত্তর দেননি।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টাও তাদের নামে ইস্যুকৃত কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের অভিপ্রায় জানিয়েছেন। এদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং তার স্ত্রী অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা অন্যতম। এর বাইরে আরও অনেকের আবেদন থাকতে পারে। তবে বাকিদের বিষয়ে জানা সম্ভব হয়নি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে প্রথম আদিলুর রহমান খান ২৫ জানুয়ারি কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণের অভিপ্রায় জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। একই দিন তিনি আবেদন জমা দেন সচিবালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত পাসপোর্ট অফিসে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি আদিলুর রহমান তার নামে ইস্যুকৃত নতুন পাসপোর্ট হাতে পান। তবে আদিলুর রহমানের স্ত্রী সায়রা রহমান খান যুক্তরাজ্যের পাসপোর্টধারী হওয়ায় বাংলাদেশি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেননি।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর বলছে, লাল রঙয়ের বিশেষ কূটনৈতিক পাসপোর্ট প্রদানের বিষয়টি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইস্যুর আগে পররাষ্ট্র থেকে সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। পরে সেখানকার নির্দেশনার ভিত্তিতে পাসপোর্ট প্রদানের ব্যবস্থা নেয় পাসপোর্ট অধিদপ্তর। একই ভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল বা সমর্পণের বিষয়েও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও সচিবদের হাতে থাকা লাল পাসপোর্ট রূপান্তরে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়। এ সংক্রান্ত আবেদন যাচাইয়ে কড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে স্পষ্টীকরণের নামে ২১ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের সংশোধনীতে বলা হয়-‘(ক) বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) সময়ে যে সকল ব্যক্তিবর্গ কোন পদে অধিষ্ঠিত থাকার কারণে তারা এবং (খ) তাদের স্পাউসগণ কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন তাদের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট জারিকৃত পত্রটি প্রযোজ্য হবে। এবং অন্যান্যদের ক্ষেত্রে পূর্বের ন্যায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণপূর্বক বিদ্যমান বিধিবিধানের আলোকে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করা যেতে পারে।’