ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনেই রাজনৈতিক সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা বিএনপি এবার জামায়াতে ইসলামীর কঠিন নির্বাচনী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কোথাও সরাসরি দ্বিমুখী লড়াই, কোথাও আবার ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা দেখছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
চারটি আসনে মোট ২০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বিএমজেপি ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা রয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, দুটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ভোটযুদ্ধ হবে, আর বাকি দুটি আসনে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতায় ফল নির্ধারিত হবে শেষ মুহূর্তে।
সাতক্ষীরা-১
তালা ও কলারোয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে আসনটিতে জয় তুলে নেয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিবের বিপরীতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ।
২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হাবিবুল ইসলাম শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলার মামলায় দণ্ডিত হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। ২০২৪ সালের পর মুক্তি পাওয়ার পর তিনি এলাকায় ফের সক্রিয় হন। নির্যাতিত নেতা হিসেবে তার প্রতি সহানুভূতির একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে বলে ধারণা করছেন ভোটাররা।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী ইজ্জত উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিকভাবে এলাকায় কাজ করে আসছেন। তার দলীয় শৃঙ্খলা ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তাকে বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
এই আসনে অতীত নির্বাচনের ফলাফলও সমীকরণকে জটিল করে তুলছে। ১৯৯১ সালে জামায়াত প্রার্থী আনসার আলী ৩৯.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ১৯৯৬ সালে জামায়াত দ্বিতীয় এবং বিএনপি চতুর্থ অবস্থানে ছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা সংসদ সদস্য ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। তালা উপজেলায় ওয়ার্কার্স পার্টির এখনও শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে।
সব মিলিয়ে এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ভোটযুদ্ধ হবে এবং জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে অল্প ব্যবধানে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
সাতক্ষীরা-২
সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-২ আসনটি মূলত জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে এবার এখানে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেকের বিপরীতে মাঠে রয়েছেন বিএনপির আব্দুর রউফ এবং জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য আশরাফুজ্জামান আশু।
বিএনপির প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুরুতে দলের ভেতরে অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটলেও শেষ পর্যন্ত কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হননি। ফলে বিএনপি সংগঠিতভাবেই নির্বাচনে নামছে।
এই আসনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জামায়াতের কাজী শামসুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জয় পান মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল। ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির এম এ জব্বার জয়ী হন। ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা দশ বছর আওয়ামী লীগের মীর মোস্তাক আহমেদ রবি সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে পরাজিত করে জাতীয় পার্টির আশরাফুজ্জামান আশু জয়ী হন।
স্থানীয়দের মতে, সামগ্রিকভাবে পাল্লা কিছুটা জামায়াতের দিকে ঝুঁকলেও বিএনপি ও জাতীয় পার্টির উপস্থিতিতে এখানে হাড্ডাহাড্ডি ত্রিমুখী লড়াই হবে।
সাতক্ষীরা-৩
আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৩ আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির শক্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য কাজী আলাউদ্দিন। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. শহিদুল আলম ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ ডা. শহিদুল আলমের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে সক্রিয় জামায়াতের জেলা শাখার সাবেক আমির মুহাদ্দিস রবিউল বাশার। ফলে এই আসনে বিএনপি, জামায়াত ও বিদ্রোহী প্রার্থী ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল বলে মনে করছেন ভোটাররা।
সাতক্ষীরা-৪
শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৪ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি। এবার এখানে বিএনপি শক্ত অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াতের প্রবীণ নেতা ও দুইবারের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিপরীতে বিএনপি প্রার্থী হয়েছেন তরুণ নেতা ড. মনিরুজ্জামান।
গাজী নজরুল ইসলামের নিজস্ব ভোটব্যাংক থাকলেও বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিকভাবে কাজ করায় দলটি এবার চাঙ্গা। শেষ মুহূর্তে বিদ্রোহীরা দলে ফিরে আসায় বিএনপির ভোটাররা সক্রিয় হয়েছেন। ফলে এখানে পরিবর্তন ও প্রত্যাবর্তনের লড়াইয়ে বিএনপি ও জামায়াত সমান শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ বলেন, বিএনপির প্রতিযোগিতা মূলত জামায়াতের সঙ্গে। চারটি আসনেই আমাদের অবস্থান সুসংহত। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে চারটিই বিএনপির হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা জেলা সেক্রেটারি আজিজুর রহমান জানান, চারটি আসনেই আমাদের বিজয়ের পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়েও আমরা সন্তুষ্ট।
জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের প্রার্থী আশরাফুজ্জামান আশু বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে সাতক্ষীরা সদর আসনে আবারও আমিই নির্বাচিত হব।