রাজশাহীতে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি-বেগম খালেদা জিয়া পরিষদ’ নামের একটি সংগঠনের নামে বাড়ি দখলচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয় করার নামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে এই সংগঠনের কার্যালয় করা হয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে রাজশাহী-২ (সদর) আসনের বিএনপির প্রার্থী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু নিজ উদ্যোগে ওই কার্যালয় উচ্ছেদ করেছেন।
বাড়ির মালিকের দাবি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অফিস করার কথা বলে একটি ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া হলেও পরে সেটিকে বিএনপি সংগঠনের জেলা ও মহানগর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। শেষে ভাড়া না দিয়ে বাড়িটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
শহরের দুই নম্বর সেক্টরের দুই নম্বর রোডের ৯৬ নম্বর চারতলা বাড়িটির মালিক আইনজীবী আকরামুল ইসলাম। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত আইনজীবী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতির তিনবারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তবে বাড়ি থেকে এ সংগঠনকে উচ্ছেদ করতে পারছিলেন না। শেষে দলের নেতাদের জানান।
আকরামুল ইসলাম জানান, গত বছরের অক্টোবরে সরকার জিয়াউর রহমান নামের এক ব্যক্তি ভবনের দোতলায় ২ হাজার ২৫০ বর্গফুটের বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। আকরামুল ইসলামকে বলা হয়েছিল, ডেভেলপার ব্যবসা করার জন্য বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তবে কিছুদিন পর আকরামুল দেখতে পান, বাড়ির সামনে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি-বেগম খালেদা জিয়া পরিষদ’ নামের সংগঠনের জেলা ও মহানগর কার্যালয় হিসেবে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন পর শতাধিক মানুষ এনে মাইক বাজিয়ে কর্মসূচিও পালন করা হয়। এ অবস্থায় বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়ারা চলে যাচ্ছিলেন। তাই সরকার জিয়াউর রহমানকে বাড়ি ছাড়তে বলা হয়। কিন্তু তিনি বাড়ি ছাড়ছিলেন না। গত ১৪ ডিসেম্বর আকরামুল ইসলাম আইনজীবীর মাধ্যমে তাকে লিগ্যাল নোটিশ দিলেও কাজ হয়নি। এ অবস্থায় শনিবার আইনজীবীর ছেলে সায়েমুল ইসলাম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।
স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা হয়, কতিপয় বিএনপির নেতাকর্মী দ্বারা আমাদের বাড়ি দখল। গত এক মাস ধরে কিছু নামধারী বিএনপি কর্মী বাসাটিতে অবৈধভাবে অবস্থান করছে এবং অফিসের নামে দখল করে রেখেছে। আমরা বারবার বাসা ছাড়ার জন্য তাগিদ দিলেও তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা বাসা ছাড়বে না। বাস্তবে তারা বাসাটি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে এবং কোনও ধরনের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল—কিছুই পরিশোধ করছে না। আমার বাবাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
এটি জানার পর রবিবার বেলা ২টায় সংগঠনটিকে উচ্ছেদ করতে নিজেই যান বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান। তিনি তার কর্মীদের দিয়ে বাড়ির সামনে থেকে সাইনবোর্ড ও ব্যানার নামিয়ে ফেলেন। তখন অফিসের ভেতরে কয়েকজন যুবক ছিলেন। তারা ভিড়ের ভেতর দিয়ে সটকে পড়েন।
বাড়ির মালিক আকরামুল ইসলাম বলেন, ‘৫৮ হাজার টাকা জামানতে মাসিক ২৯ হাজার টাকায় বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনও ভাড়া দেয়নি। এমনকি বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের বিলও দেয়নি। বাসা ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হলেও কাজ হয়নি। তারা দখলের চেষ্টা করছিল। এলাকার এমন কোনও বিএনপি নেতা নেই, যার কাছে যাইনি। তাতেও কাজ হয়নি। মিনু ভাই বিষয়টি জানতে পেরে নিজেই এসে উচ্ছেদ করেছেন। অফিসের ভেতরে কিছু জিনিসপত্র আছে। এজন্য মিনু ভাই তালা দিয়ে চাবি নিয়ে গেছেন। তারা এসে ঝামেলা করলে চাবি মিনু ভাইয়ের কাছে আছে বলে দিতে বলেছেন।’
উচ্ছেদের সময় বাড়ির সামনে টাঙানো একটি ব্যানারে দেখা যায়, সরকার জিয়াউর রহমান ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি–বেগম খালেদা জিয়া পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে নিজের ছবি ব্যবহার করেছেন। একই ব্যানারে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জিয়াউর রহমান নামের আরেক ব্যক্তির ছবিও ছিল। সরকার জিয়াউরের বাড়ি রাজশাহী নগরীর সপুরা নামোপাড়া মহল্লায় এবং অপর জিয়াউর রহমানের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায়।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি–খালেদা জিয়া পরিষদ’ নামে বিএনপির কোনও স্বীকৃত সংগঠন নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কার্যালয়ের কার্যক্রম সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেখেই ব্যবস্থা নিই।’
তিনি জানান, বাড়ির মালিক বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় সরল বিশ্বাসে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়েছিলেন। পরে দেখা যায়, প্রতারণামূলকভাবে ভবনটি ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। বিষয়টি দলীয় কেন্দ্রকে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি সরকার জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, আমি রাজশাহী নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলাম এবং শাহমখদুম থানা বিএনপির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। এ ছাড়া আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া পরিষদের জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলাম। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমানও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।’
সরকার জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বিএনপির সহযোগী সংগঠন আছে প্রায় ২০০টি। সবাই সব সংগঠন না-ও চিনতে পারেন। কিন্তু আমাদের সংগঠন ভুঁইফোড় নয়। আমাদের বিভিন্ন জায়গায় কমিটি আছে। আমরা বাড়ি দখলেরও চেষ্টা করিনি। বাড়িওয়ালা ভাড়া দিয়েছেন বলেই উঠেছি। তিনি বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু ছাড়তে হলেও তো সময় দরকার। এজন্য ছাড়া যায়নি। আমরা বিভিন্ন জায়গায় অফিস দেখছিলাম। পছন্দ হলে চলে যেতাম আমরা।’