আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আটটি আসনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে ‘১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের’ শরিক বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এসব আসনের ছয়টিতে জামায়াতে ইসলামী এবং বাকি দুটিতে ঐক্যের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি প্রার্থী রেখেছে। ফলে আসনগুলোতে বিরোধী জোটের বাইরেও ‘ঘরের শত্রুর’ সঙ্গে লড়তে হবে সাড়ে চার দশকের পুরোনো দল খেলাফত আন্দোলনকে।
ঢাকা-৭ আসনে মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, ঢাকা-১৬ আসনে মাওলানা তাওহিদুজ্জামান, শরীয়তপুর-২ আসনে মাওলানা মাহমুদুল হাসান, নেত্রকোনা-২ আসনে মাওলানা গাজী আবদুর রহিম, ফেনী-১ আসনে মাওলানা আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, ফেনী-২ আসনে আবুল হোসাইন ফারুক ও ফেনী-৩ আসনে অ্যাডভোকেট খালিদুজ্জামান খালেদ পাটোয়ারীকে প্রার্থী করেছে খেলাফত আন্দোলন।
১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকলেও দলটিকে কোনো আসন ছাড়া হয়নি। এমনকি খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী পর্যন্ত কোনো ছাড় পাননি। এ নিয়ে দলের ভেতরে ক্ষোভ থাকলেও, নির্বাচনের আগে ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন না বলে স্ট্রিমকে জানিয়েছেন নেতারা।
১৯৮১ সালে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর। ‘তওবার রাজনীতির’ প্রবর্তক খ্যাতি পাওয়া হাফেজ্জি হুজুরের পরে দলটির নেতৃত্বে এসেছেন তাঁর সন্তান ও নাতিরা। বর্তমানে আমির তাঁর নাতি মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী।
আসনবিহীন সমঝোতা কেন
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উচ্চকক্ষে খেলাফত আন্দোলনকে অন্তত দুটি আসন ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। এর সঙ্গে আরও কয়েকটি কারণে নির্বাচনী ঐক্য অটুট রেখেছেন বলে জানিয়েছেন খেলাফতের নেতারা।
দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন স্ট্রিমকে জানান, চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ার পরে খেলাফত আন্দোলন সরে গেলে সারাদেশে ইসলামপন্থীদের নিয়ে যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে, তা ব্যাহত হতো। এতে বিপক্ষ শক্তি লাভবান হতো।
আসন ছাড় না পাওয়ায় দলে ক্ষোভ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘খেলাফত আন্দোলন যে ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তা আমাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
চ্যালেঞ্জেে খেলাফতের প্রার্থীরা
আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে জামায়াত জোটের মৌলিক সিদ্ধান্ত ছিল দলের শীর্ষ নেতারা যেখান থেকে নির্বাচন করবেন, সেখানে অন্য কাউকে প্রার্থী করা হবে না। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা-৭ (চকবাজার, বংশালসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা) আসন চেয়েছিল খেলাফত আন্দোলন। এই এলাকায় হাফেজ্জি হুজুর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা জামিয়া নূরিয়া এবং দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এখানে খেলাফত আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী প্রার্থী হয়েছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আসনটি ছাড়েনি ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী। এখানে জোরেশোরে কাজ করছেন তাদের প্রার্থী এনায়েত উল্লাহ। ধনাঢ্য এই ব্যবসায়ী ঢাকায় জামায়াতের সর্বোচ্চ সম্পদের (১১৬ কোটি টাকা) অধিকারী।
এই আসনে ঐক্যের শরিক এনসিপির প্রভাবশালী নেতা তারেক আদেল মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তাঁর বাবা জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল আওয়ামী লীগের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ মেয়র হানিফকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এনসিপির তারেক আদেলকেও আসনটি ছাড়েনি জামায়াত।
সূত্রের দাবি, শুক্রবার জামিয়া নূরিয়ায় যান জামায়াত প্রার্থী এনায়েত উল্লাহ। এ সময় তিনি খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তবে হাবিবুল্লাহ মিয়াজী সরে না দাঁড়ানোর ব্যাপারে নিজের অবস্থান জানান এবং এনায়েতুল্লাহকে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পরামর্শ দেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে খেলাফত আন্দোলন প্রার্থী করেছে আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সীকে। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই ১০ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারায়ণগঞ্জ জেলার সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শাহজাহান শিবলী। এখানেও জামায়াত কাজ করছে তাদের দলীয় প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার জন্য। খেলাফত আন্দোলন এই আসনটি পেতে জামায়াতের সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে গেলেও আসনটি তাদের ছাড়া হয়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার জামায়াত আমির তাঁর নির্বাচনী প্রচার শুরুর অনুষ্ঠানে নিজ হাতে ঢাকা-১৬ (পল্লবী-রূপনগর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল আবদুল বাতেনের (অব.) হাতে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দিয়েছেন। এই আসনে খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা তাওহিদুজ্জামান।
শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখিপুর) আসনে মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে খেলাফত আন্দোলন। কিন্তু এখানেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জোরদার প্রচার নিয়ে মাঠে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মাহমুদ হোসেন।
নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনে খেলাফত আন্দোলন মনোনয়ন দিয়েছে মাওলানা গাজী আবদুর রহিমকে। এই আসনে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে কাজ করেছেন জামায়াতের প্রার্থী সাবেক জেলা আমির এনামুল হক। তবে শেষ পর্যন্ত এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠানকে ১০ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে প্রার্থী করা হয়েছে। যদিও এনামুল হকের মনোনয়ন প্রত্যাহার না করতে জামায়াত সমর্থকরা আন্দোলনে করেছেন। এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা আবদুল কাইয়ুমের জনপ্রিয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে ফেনীর তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে খেলাফত আন্দোলন। দলটির তিন প্রার্থী হলেন– ফেনী-১ আসনে আনোয়ার উল্লাহ ভূঁইয়া, ফেনী-২ আসনে মোহাম্মদ আবুল হোসেন ও ফেনী-৩ আসনে অ্যাডভোকেট খালিদুজ্জামান খালেদ পাটোয়ারী।
এর মধ্যে ফেনী-২ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া ছাড়াও রয়েছেন এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। জামায়াত প্রার্থী মঞ্জুকে সমর্থন দিয়ে প্রতীক বরাদ্দের আগেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তবে ফেনী-১ আসনে জামায়াতের এস এম কামাল উদ্দিন ও ফেনী-৩ আসনে জামায়াতের মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন। ফলে ফেনীর তিনটি আসনেই খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থীদের ঘরে-বাইরে লড়াই করতে হবে।