ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি এজাহার দায়ের করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির। আজ বুধবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় এসব এজাহার দায়ের করা হয়। ছাত্রদলের দায়ের করা এজাহারে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৮-সহ অজ্ঞাত ৪০-৪৫ এবং অপরপক্ষের এজাহারে ছাত্রদলের ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৩০-৪০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার ছাত্রদল নেতা মাহবুব হাসানের দায়ে করা এজাহারে অভিযুক্তরা হলেন ছাত্রশিবিরের আতিকুর রহমান নোমান, ইয়াসিন আরাফাত, আল-আমিন, সালাউদ্দিন আহমেদ, গোলাম ওয়াহিদ, মেজবাউল হক জিহাদ, তানজিল হাসান মন্ডল, সাইফুল ইসলাম তানভীর, আয়মান, শেখ রাইসুল, সিয়াম হোসেন, নাফিস সাদিক, সিলমন হোসেন, ইয়াসিন মিরাজ, নুর হক, হাসান নাসরুল্লাহ, জামিলুর রহমান সাদ, সাগর আলী, জিহাদ হোসেন, বিপুল হোসেন, আল আমিন, আব্দুল্লাহ কাফি, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, বিপুল মাহমুদ, সোহেল রানা, তানভীর আহমেদ, সিরাতুন্নবী ও জহিরুল ইসলাম।
অপরদিকে ছাত্রশিবিরের পলিটেকনিক শাখার এইচআরডি সম্পাদক মারুফ বিল্লাহ জিহাদের দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্তরা হলেন— মুসি, মাহফুজ, রবিন, তুর্য, বাপ্পী, পলাশ, আল শাহরিয়ার সিফাত, মো. শারওয়ার সিফাত, মাহবুব হাসান মেহেদী, জোনায়েদ হোসেন মুন্না, মো. শইকত হোসেন, নাফিউর রহমান শ্রাবণ, মো. ফয়েজ আহাম্মেদ, মো. মাহমুদুল হাসান স্বাধীন, মো. আশিক প্রধান, সচিন সরকার নয়ন ও অনিক খান।
ছাত্রদলের দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, ২ মার্চ রাত আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিটের সময় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন লতিফ ছাত্রাবাস হল মোড় চায়ের দোকানের সামনে আমিসহ আমার কয়েক বন্ধু চা খাওয়া অবস্থায় শিবিরের আতিকুর রহমান নোমান, ইয়াসিন আরাফাত, আল-আমিন, সালাউদ্দিন আহমেদ ও আয়মান আমাদের দেখে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে ভিডিও করতে থাকে। বিষয়টি আমি দেখতে পেয়ে আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার সঠিক কোন সদুত্তর দিতে পারে না। একপর্যায়ে আসামীরা আমাদেরকে ব্যাড কমেন্ট করাসহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। অতঃপর আসামীদের সাথে আমাদের তর্ক-বিতর্ক হলে তার ১/২ মিনিট পর তারা ছাত্রাবাসে চলে যান। আমি ও সঙ্গীয় বন্ধুরাসহ ঘটনাস্থলে অবস্থানকালে সকল আসামীসহ অজ্ঞাতনামা ৪০-৪৫ জন শিবিরের লোকজন একই উদ্দেশ্যে বেআইনি জনতায় দলবদ্ধ হয়ে হাতে পিস্তল, লাঠি-সোঁটা, ধারালো সুইস গিয়ার (ছুরি), স্টিলের পাইপ, ছোট ছুরি ও হাসুয়া নিয়ে আমাদের উপর অর্তিকভাবে হামলা করে।
এজাহার অনুযায়ী, আসামীরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের এলোপাথারি মারপিট করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করে। তারা মারপিট করা অবস্থায় এজাহার দায়েরকারী মো. মাহবুব হাসানের বন্ধু মো. মাহবুব হাসানকে হত্যার উদ্দেশ্যে ইয়াসিন আরাফাতের হাতে থাকা পিস্তল ও মেজবাউল হক জিহাদের হাতে থাকা সুইস গিয়ার দিয়ে তার মাথায় ও পেটে ঠেকায় এবং জানে মেরে ফেলার হুমকি প্রদান করে। মারপিটে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে আসামীরা তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে লতিফ ছাত্রাবাসে চলে যায়।
এজাহারে মাহবুব হাসান আরও বলেন, পরবর্তীতে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আমিসহ আমার বন্ধুরা লতিফ ছাত্রাবাসে প্রবেশ করামাত্রই আসামীরা আবারও আমাদের ওপর আক্রমণ করে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, এ সময় ধারালো সুইস গিয়ার, ছোরা, লোহার পাইপ, হকস্টিক, লাঠিসোঁটা, লোহার চেইন প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এতে তার ছোট ভাই আব্দুল্লাহ আস সাদিক, ইয়াসিন আহম্মেদ, শাহিন আহম্মেদ গুরুতর আহত হয়। পরে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শমরিতা মেডিকেল কলেজ হাসতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আস সাদিককে উন্নত চিকিৎসার জন্য বক্ষব্যাধি হাসাপাতালে নেওয়া হয়েছে।
অপরদিকে শিবিরের এইচআরডি সম্পাদক মারুফ বিল্লাহ জিহাদের দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, ২ মার্চ দিবাগত রাত আনুমানিক সোয়া ১২টার দিকে আমি ও অন্যান্য সাধারণ ছাত্ররা ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের লতিফ ছাত্রাবাসের নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করছিলাম। ওই সময় মুসির অপর আসামীসহ ৭-৮ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি চাপাতি, ইলেকট্রনিক্স গান, স্ট্যাম্প, রড, হকিস্টিক ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হঠাৎ আমার ১১০ নং পশ্চিম শাখার কক্ষে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। প্রবেশ করেই তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে এবং অতর্কিতে আমার উপর হামলা চালায়। রবিন আমার বুকে লাথি মারে এবং তার হাতে থাকা স্ট্যাম্প দিয়ে আমার বুক, ডান হাত ও পিঠে এলোপাথাড়িভাবে আঘাত করে, ফলে আমি গুরুতরভাবে আহত হই। আমার রুমমেট জিহাদ ইসলাম আমাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে রবিন তাকেও স্ট্যাম্প দিয়ে মারধর করে। এরপর আসামীরা আমাকে ও জিহাদ ইসলামকে টেনে-হিঁচড়ে কক্ষের বাইরে নিয়ে গিয়ে পুনরায় মারধর করতে থাকে। আমরা কোনোরকমে ধাক্কাধাক্কি করে তাদের কবল থেকে ছুটে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাই।
তিনি লিখেছেন, আমাদের চিৎকার শুনে ১২৭ নং কক্ষের নুর হক বের হয়ে আসামীদের বাধা দিতে গেলে মুসি তার হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে নুর হকের মাথার তালুতে কোপ দেয়, ফলে সে রক্তাক্ত জখম হয়। ১০৭ নং কক্ষ থেকে গোলাম ওয়াহিদ বের হয়ে এসে প্রতিবাদ করলে তাকে মাথায় ও হাতে কোপ দিয়ে গুরুতর রক্তাত্ত জখম করে মুসি। এসময় আসামীরা উচ্চস্বরে স্লোগান দিতে থাকে— ‘একটা একটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর!’ এবং ঘোষণা করে যে তারা লতিফ ছাত্রাবাস ‘শিবিরমুক্ত’ করবে। পরবর্তীতে আরও প্রায় ৩০-৪০ জন অজ্ঞাতনামা বহিরাগত ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছাত্রাবাসে প্রবেশ করে। তারা মুসির নেতৃত্বে কক্ষ থেকে কক্ষে গিয়ে সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলা চালাতে থাকে।
এজাহারে বলা হয়, আসামী মাহফুজ ২২৩ নং পশ্চিম শাখার কক্ষে অবস্থানরত আরিফুল ইসলামকে তার হাতে থাকা ইলেকট্রনিক্স গান দ্বারা শক প্রদান করে, ফলে আরিফুল ইসলাম অজ্ঞান হয়ে পড়ে। ওই কক্ষেই অবস্থানরত শান্ত সরকারকে মুসি চাপাতি দিয়ে তার পায়ের রগ কেটে ফেলার হুমকি দেয় এবং অন্য আসামীদের নির্দেশ দেয় শান্ত সরকারের হাত-পা চেপে ধরতে। প্রাণভয়ে আতঙ্কিত হয়ে শান্ত সরকার নিজের প্রাণ রক্ষার্থে ২য় তলা থেকে লাফ দেয়। এতে তার ডান পায়ের হাড় ভেঙে যায়। এ সময় ২২৩ নং কক্ষের সামনে উপস্থিত আতিকুর রহমান নোমানকে আসামী তুর্য প্রথমে মারধর শুরু করে। পরবর্তীতে অন্য আসামীরা তাকে এলোপাথাড়িভাবে মারধর
করে এবং গুরুতর আহত অবস্থায় ২য় তলা থেকে নিচে ফেলে দেয়। ফলে নোমান মারাত্মকভাবে আহত হয়।
এজাহারের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ২৩০ নং কক্ষে সাইফ ঘুমাচ্ছিল, তাকে চাপাতির পিছনের বাট দিয়ে আঘাত করে মুসি। শোরগোল শুনে ২২৮ নং কক্ষ থেকে আল আমিন বেরিয়ে এলে মাহবুব হাসান মেহেদী তার হাতে থাকা হকিস্টিক দিয়ে তাকে আঘাত করে এবং নাফিউর রহমান শ্রাবণ, মো. ফয়েজ আহাম্মেদ ও মো. মাহমুদুল হাসান স্বাধীন আসামী তাকে স্ট্যাম্প ও লোহার রড দিয়ে মাটিতে ফেলে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। এ অবস্থায় আল ইমরান প্রতিবাদ করলে আসামীরা তাকে ধাওয়া করে এবং মুসি তার হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে ও অন্য আসামীরা তাদের হাতে থাকা হকিস্টিক দিয়ে তাকে এলোপাথাড়ি আঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে। পরবর্তীতে আসামীরা মিছিল করে হল প্রদক্ষিণ করতে থাকে এবং কক্ষে কক্ষে গিয়ে ভাংচুর করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার পর পরিস্তিতি কিছুটা শান্ত হয়।
এর আবেদন অংশে বলা হয়েছে, ‘আসামীরা সংঘবদ্ধভাবে, পরিকল্পিতভাবে, দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছাত্রাবাসে সন্ত্রাসী হামলা চালায়, গুরুতর জখম করে এবং ছাত্রদের প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে। তাদের এ কর্মকাণ্ডে ছাত্রাবাসে চরম ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি দণ্ডবিধির ১৪৩/১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩০৮/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩৫২/৫০৬ ইত্যাদি ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অতএব, আসামীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক প্রয়োজনীয় তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।’