Image description
 

শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে বিচ্ছেদ হলো মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের। দলটি বলছে, বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা না হওয়ায় তারা এককভাবে দলীয় প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে ১১টি আসনে নির্বাচন করবে। দলের সভাপতি মাহমুদুর রহমান ঢাকা-১৮ (বৃহত্তর উত্তরা) ও বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বিএনপির বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটল।

‘বদলে দাও বাংলাদেশ’- এই স্লোগান সামনে রেখে নাগরিক ঐক্য নির্বাচনে নামছে। মাহমুদুর রহমান মান্না ছাড়া নাগরিক ঐক্যের আরও নয়জন নেতা প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রংপুর-৫ আসনে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাখখারুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিব আনোয়ার, জামালপুর-৪ আসনে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. কবির হাসান, পাবনা-৪ আসনে অর্থ বিষয়ক সম্পাদক শাহনাজ রানু। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-৯ আসনে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য স্বপন মজুমদার, চাঁদপুর-২ আসনে এনামুল হক, কুড়িগ্রাম-২ আসনে মেজর (অব.) আব্দুস সালাম, রাজশাহী-২ আসনে মোহাম্মদ সামছুল আলম ও লক্ষ্মীপুর-২ আসনে মোহাম্মদ রেজাউল করিম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না ও তাঁর দল নাগরিক ঐক্যের এককভাবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির সঙ্গে মাহমুদুর রহমানের প্রায় এক যুগের সখ্য ও রাজনৈতিক পথচলার আপাত সমাপ্ত হলো। কেন এমনটি হলো, এ ব্যাপারে বিএনপির কেউ মুখ খুলছেন না।

মাহমুদুর রহমান আজ বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি আমাকে বগুড়া-২ আসনে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিল, আবার তাদের একজন প্রার্থীও দিল। পরে ঋণখেলাপি, হাবিজাবি নানান কথা বলা হলেও ঠিক কী কারণে এটি করেছে আমি জানি না।’

গত ২৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১০ জন নেতার নাম উল্লেখ করে তাঁদের সঙ্গে আসন সমঝোতার কথা জানিয়েছিলেন। ওই তালিকায় বগুড়া-২ আসনে মাহমুদুর রহমানের নামও ছিল। কিন্তু পরে বিএনপি এ আসনে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির নেতা শাহে আলমকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক দেয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে মাহমুদুর রহমান ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন। সেখানেও বিএনপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে প্রার্থী করে। দুজনেই বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন।

এ দিকে মাহমুদুর রহমানও ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ আসনে প্রার্থী রয়েছেন। গত সোমবার জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে নাগরিক ঐক্য এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এবং দুটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন।

‘আগে রাজনীতি, পরে মন্ত্রিত্ব’

গত শুক্রবার রাতে বুকে ব্যথা নিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তাঁর এনজিওগ্রাম হয়। চিকিৎসা শেষে তিনি বাসায় ফিরেছেন। এর মধ্যে তাঁকে দেখতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাসপাতালে যান।

মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, ‘আমার এনজিওগ্রাম হওয়ার আগে একজন সাংবাদিক এসে বলেন যে, আমি যেহেতু অসুস্থ নির্বাচন না করাই ভালো হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান আমাকে মন্ত্রী বানাবেন। এতে রাজি থাকলে তিনি আমাকে দেখতে আসবেন।’

মান্না জানান, ওই সাংবাদিক পরে আরও একবার তাঁকে ফোন করে মতামত জানতে চান। তখন তিনি নির্বাচন না করে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একজন নেতাকে এই বিষয়টি জানান। বিএনপির ওই নেতা প্রস্তাবের সত্যতা নিশ্চিত করেন। পরে বিএনপির ওই নেতার কাছেও তিনি ওই প্রস্তাবে সম্মত নন বলে জানিয়ে দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মান্না গতকাল মঙ্গলবার রাতে ঢাকার উত্তরায় মুগ্ধ মঞ্চে শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবি ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারণায় অংশ নেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতি করব। রাজনীতি মানেই যেহেতু বর্তমানে নির্বাচন, তাই নির্বাচন ছাড়ব না। মন্ত্রী হলে পরে হব, না হলে না হব। কিন্তু নির্বাচন ছাড়ব না।’

সেখানে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রসঙ্গে মান্না বলেন, ‘আমাকে কেউ কেউ বলেছিল আপনাকে মন্ত্রী বানানো হবে, এমপি হওয়ার দরকার কী। মন্ত্রী বানানোর আশ্বাস দিয়ে আমি রাজনীতি করা বন্ধ করে দেব কেন? এটাতো সদকা দেওয়ার মতো, ভিক্ষা দেওয়ার মতো হবে।’

২০১৩ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা দৃশ্যমান হয়। এর পর ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক ছিল নাগরিক ঐক্য। সে নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে দলটি পাঁচটি আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে, যার একটি ছিল বগুড়া-২। পরে ২০২২ সালের আগস্টে জেএসডি, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্যসহ ছয়টি দল মিলে গঠিত হয় ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। এই জোটকে সঙ্গে রেখেই বিগত দিনে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় বিএনপি। সে সময়কার সমমনা মিত্র দলগুলোকে মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও সর্বশেষ আসন সমঝোতায় নাগরিক ঐক্যের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। একইভাবে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডিও আসন সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।