জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার শহীদ মীর মীর কাশের আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমানকে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার বাসা থেকে একদল অস্ত্রধারী লোক টেনে হেঁচড়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ আট বছর গুম করে রাখে। গুমের থাকার সময় একজন প্রহরী তারসঙ্গে নরম ভাষায় কথা বলেছিল। এতে তিনি সাহস পেয়ে তাকে অভিযোগের সুরে বলেন, এভাবে কোনো মানুষকে রাখা হয় কি না? জবাবে সে বলল, আপনি ভাগ্যবান, আপনি বেঁচে আছেন। আপনার মনে পড়ে এখানে আনার দিন আপনার ওজন মাপা হয়েছিল। তখন আপনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর এসিড দিয়ে চেহারা ও হাত ঝলসে দিয়ে ওজন অনুযায়ী ইট বেধে বরিশালের নদীতে আপনাকে ফেলে দেওয়া হবে।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে তিনি এসব কথা বলেন।
জবানবন্দিতে আরমান বলেন, গত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার যাদেরকে গুম করে রেখেছিল, আমি তাদের একজন। আমি আমার পিতা শহীদ মীর কাসেম আলী মামলায় নিয়োজিত আইনজীবী ছিলাম। ট্রাইব্যুনালে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও খারিজ হয়েছিল এবং রিভিউ শুনানি চলছিল। এসময় ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার বাসা থেকে একদল অস্ত্রধারী লোক টেনে হেঁচড়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ আট বছর গুম করে রাখে।
জবানবন্দিতে আরমান বলেন, তুলে নিয়ে তাকে একটি সংকীর্ণ সেলে রাখা হয়। পরনের জামা-কাপড় খুলে নিয়ে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরতে দেয়। এরপর চোখ বেঁধের রাখে। যে ঘরে রাখা হয় সে ঘরের মেঝে স্যাঁতসেতে ছিল সেখানে ইঁদুর ও তেলাপোকা চলাফেরা করত। সেখানে তাকে ১৬ দিন রাখা হয়। এই সময়ে তিনি বেশ কয়েকবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে অন্য একটি সেলে নেওয়া হয়। সেলটি আগের চেয়ে অনেক বড় এবং ফ্লোর টাইলস্ করা। তিনি বন্দি থাকা অবস্থায় সিলিংয়ের একটা অংশ খুলে পড়েছিল; পরে মেরামত করা হয়। পরবর্তীতে তিনি প্রধান উপদেষ্টা, গুম কমিশনের সদস্য ও চীফ প্রসিকিউটরের উপস্থিতিতে এই সেলটি শনাক্ত করেন। সেলটি ছিল র্যাব-১ কম্পাউন্ডে, র্যাব সদরদপ্তরের অধীনে পরিচালিত, র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের টিএফআই সেল।
জবানবন্দিতে মীর আরমান বলেন, সেলের প্রহরীদের আচরণ ছিল নির্মম। তাকে সবসময় চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা হত। খাবারের সময় ডান হাত খুলে দিত। টয়লেটের সময় বাম হাত খুলে দিত। গভীর রাতে দু’হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরানো হতো। নামাযের সময় বলা হত না, দিন না রাত বুঝতে পারতেন না। বাইরের আওয়াজ যাতে ভেতরে ঢুকেতে করতে না পারে এজন্য একজস্ট ফ্যান চালিয়ে রাখা হত। শীতকালে ফ্যান বন্ধ রাখা হলে বাইরের শব্দ শুনতে পেতেন। বিমান, ট্রেন এবং জোরে গাড়ি চলাচলের শব্দ শুনতেন।এছাড়া অন্যান্য সেলের বন্দিদের নির্যাতনের সময় আর্তচিৎকার শুনা যেত।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, একদিন প্রহরিদের বলি এভাবে বেঁচে থেকে কি লাভ। তখন তারা বলে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আপনার বিষয়ে নির্দেশ আসে। আমাদের করার কিছু নাই। একদিন ঔষধ দেওয়ার সময় একটি কাঠের বাক্স দেওয়া হয়। আমি চোখ বাঁধা অবস্থায় নিচ দিয়ে একটু দেখতে পেতাম; দেখি ওই বাক্সের গায়ে লেখা টিএফআই । ওষধগুলো একটি বড় ঠোঙ্গার মধ্যে ছিল, তার গায়ে লেখা ভিআইপি-২। ঘায়ে মলম দেওয়ার জন্য আমার হাতে বের করে দিত। একদিন টিউবটি আমার হাতে দেয়, টিউবের গায়ে লাল অক্ষরে প্রোপার্টি অব র্যাব এইচ কিউ লেখা ছিল। এইচ কিউ অর্থ হেডকোয়ার্টার। আমি ব্যথায় মেঝেতে বসতে পারতাম না তখন নামাজ পরার জন্য আমাকে একটি চেয়ার দেওয়া হয়েছিল, চেয়ারের গায়ে লেখা ছিল আই এন টি।
জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, কয়েক বছর পর একজন প্রহরী নরম ভাষায় কথা বলেছিল। এতে আমি সাহস পেয়ে তাকে অভিযোগের সুরে বললাম, এভাবে কোনো মানুষকে রাখা হয় কি না। জবাবে সে বলল, আপনি ভাগ্যবান, আপনি বেঁচে আছেন। আপনার মনে পড়ে এখানে আনার দিন আপনার ওজন মাপা হয়েছিল। তখন আপনাকে হত্যার সিদ্ধা্ত নেওয়া হয়। এরপর এসিড দিয়ে চেহারা ও হাত ঝলসে দিয়ে ওজন অনুযায়ী ইট বেধে বরিশালের নদীতে আপনাকে ফেলে দেওয়া হবে। কিন্তু যিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তিনি কয়েকদিনের মধ্যেই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়। এরপর আপনার বিষয়ে সিদ্ধান্তটি ঝুলে যায়। আপনি আরো সৌভাগ্যবান জিয়া এখন আর এখানে নাই। থাকলে আপনি এতদিন হায়াত পেতেন না।
আরমান বলেন, আমি যখন গুম হই তখন জিয়া কর্ণেল পদে ছিল এবং পরে জেনারেল হয়। আমি জানতাম সে গুমের মাস্টারমাইন্ড। আমাকে তিন বেলা খাবার দেওয়া হত। খাবারের পরিমাণ সীমিত ছিল। আমাকে মুক্ত করার কয়েক মাস আগে থেকে খাবার খাওয়ার পরে সারা শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হত। মনে হত হাজার হাজার পিঁপড়া কামরাচ্ছে। খাবার পর প্লেট ধোয়ার সময় প্লেটে পানি পরলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মত বুদবুদ ওঠত। তখন সন্দেহ তার খাবারে কিছু মেশাচ্ছে। রমজান এলে তারা আমাকে জানাত। রমজান মাস ধরে আমি হিসাব করতাম ভিতরে কতদিন ছিলাম। আমি আটটি রমজান্ ওই গুম ছিলাম।
জবানবন্দিতে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, একদিন গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ছিলাম তখন কয়েকজন আমার সেলে প্রবেশ করে। চোখ সাধারণত সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত পোষাকের ফেব্রিক দিয়ে বাঁধা হত। সেদিন একটি গামছা দিয়ে চোখ বাঁধে, অন্য একটি গামছা দিয়ে হাত বাঁধে। এরপর একটি গাড়ির মেঝেতে শুইয়ে একজন প্রহরী আমার বুকের ওপর বসেন, আরেকজন আমার উরুর ওপর বসেন। গাড়িটি আনুমানিক ৩০ মিনিটের মত চলে থেমে যায়। পরে আমাকে তুলে বসানো হয়। তখন একজন বয়স্কলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করে এতদিন কোথায় ছিলি? এবং আমরা কারা? আমি ভয়ে পেয়ে বলি, জানি না। তখন তারা আমাকে বলে সবাইকে এটাই বলবি। এরপর গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। আমি মনে করেছিলাম আমাকে হত্যা করা হচ্ছে। আমি সূরা ইয়াসিন পড়তে থাকি। যেন মৃত্যুটা সহজ হয়।
জবানবন্দিতে আরো বলেন, অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারি আমি একা। পরে আমি চেষ্টা করে চোখ ও হাতের বাঁধন খুলে ফেলি। আমি দূরে আলো দেখতে পাই আমি ওই আলোর দিকে হাটতে থাকি। আলোর কাছে গিয়ে দেখতে পাই একটি নির্মাণাধীন ভবন এবং সেখানে সাইনবোর্ডে লেখা ‘দিয়াবাড়ী, উত্তরা’। সেখান থেকে ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার উত্তরা শাখায় যাই। আমি সেখানে দারোয়ান আমাকে চিনতে না পেরে ঢুকতে দেয়নি। পরে ম্যানেজার আসলে তার কাছে যাই। তিনিও আমাকে চিনতে পারেননি। তখন আমি তাকে ইংরেজিতে বলি আই নিড হেল্প। তার মোবাইলটি চেয়ে নেই। মোবাইলটি নিয়ে গুগলে গিয়ে আমার নাম সার্চ করি। তখন আমার গুমের পূর্বের ছবি ভেসে উঠে। সেই ছবিটি আমি আমার মুখের পাশে ধরে বলি এই ছবির লোককে আপনি চিনেন কি না? তখন তিনি আমাকে চিনতে পারেন এবং আবেগে কেঁদে ওঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, আমরা দ্বিতীয় বার স্বাধীন হলাম, আমাদের ভাইকেও ফেরত পেলাম। আমি জানতে পারি ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেয়ে পালিয়ে গেছেন।