আসন্ন সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ১০টি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা তথা নির্বাচনি ঐক্যের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বড় জয়ের টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। শুধু নির্বাচনেই নয়, বিজয়ী হলে সরকার গঠনে যেন কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরি না হয়, সেজন্য আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে জামায়াত।
সূত্রমতে, সরকার পরিচালনার নীতি-কৌশলসহ যত ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, তা মোকাবিলার টার্গেট নিয়েই এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এক্ষেত্রে দক্ষতার নজির স্থাপন করতে চায় তারা। নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি জয় পেলে শরিকসহ বিভিন্ন দল নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের টার্গেট রয়েছে তাদের। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার প্রয়োজনীয় মৌলিক পলিসি পেপার চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। সম্প্রতি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে সেগুলো অনুমোদন করা হয়েছে। সেই পলিসি নিয়ে বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে দলটি।
এ বিষয়ে আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে দিনব্যাপী ‘পলিসি সামিট’। এতে দেশের রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, পেশাদার এবং নীতি বিশেষজ্ঞরা শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন।
সূত্রমতে, জামায়াতের এবারের নির্বাচনি স্লোগান হচ্ছেÑ ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’। এই স্লোগানকে সামনে রেখে একটি ন্যায়সঙ্গত, দুর্নীতিমুক্ত ও নাগরিক-প্রধান বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। কার্যকর, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনমুখী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ওপর প্রাধান্য দিয়ে জামায়াতের শাসন কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। সেই বিষয়গুলোর ডিজিটাল উপস্থাপনা করা হবে আজকের সম্মেলনে। এ বিষয়ে মতবিনিময় ও সুপারিশ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল সোমবার জানান, রাষ্ট্র পরিচালনার যাবতীয় বিষয় নিয়ে আমাদের দলের পলিসি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেগুলো বিশিষ্টজনদের সামনে উপস্থাপন এবং মতামত নেওয়া হবে।
সূত্রমতে, সরকার গঠনের জন্য জরুরি প্রয়োজনমত দক্ষ জনবল পেতে জামায়াত সংশ্লিষ্ট ছাড়াও দেশে-বিদেশে অবস্থানরত শুভাকাঙ্ক্ষী ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে নিয়ে বিশেষজ্ঞ টিম প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বিষয়টি ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরও অবহিত করেছে জামায়াত। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দলটির নীতি ও অবস্থান সম্পর্কে জানার পর আন্তর্জাতিক মহলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে জামায়াতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে বিভিন্ন মহল পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। জামায়াতের নেতাদের মতে, সারাদেশে জনসমর্থন বৃদ্ধি এবং আগামী নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় এই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। বাস্তবে সরকার পরিচালনায় অন্য যে কোনো দলের তুলনায় জামায়াতের বেশি দক্ষ ও মেধাবী জনবল রয়েছে বলেও দাবি তাদের।
এ বিষয়ে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আগামী নির্বাচনে জামায়াতের বিজয়ের সম্ভাবনা যত স্পষ্ট হচ্ছে, ততই কিছু মহল থেকে অপপ্রচার বাড়ছে। এসব অপপ্রচার নতুন নয়, দেশবাসী এসব বিশ্বাস করে না।
তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন ও সরকার গঠনÑসব দিক নিয়েই আমাদের প্রস্তুতি চলছে। আমরা একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচন করতে চাই। বিজয়ী হলে জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াত আমির। সৎ, নীতিবান ও দক্ষদের নিয়ে ক্যাবিনেট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।
আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকায় নিযুক্ত প্রায় সব দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক হয়েছে। এ সময় তারা আমাদের মৌলিক পলিসিগুলো জানতে চান। তখন তাদের কাছে সংখ্যালঘু অধিকার, জেন্ডার ইস্যু, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দলের স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। তারা বিভিন্ন তথ্য জেনে জামায়াতকে অনেক বেশি ডায়নামিক মনে করছে।
তিনি আরো জানান, জামায়াত ক্ষমতায় আসা নিয়ে বিদেশি মহলের প্রকাশ্য কোনো বিরোধিতা বা নেতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যায়নি। বরং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন কূটনীতিকরা। দেশ-জাতির স্বার্থে উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর পরামর্শ ও পরস্পর সহযোগিতা লাগবে। সবাই প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন।
সরকার পরিচালনার সক্ষমতা সম্পর্কে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা জানান, জামায়াতে আগে থেকেই অনেক দক্ষ লোক আছে। আমরা বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে আসছি। ব্যাংকিং, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন সেক্টরে জামায়াতের দক্ষ জনবল কাজ করছে। সম্ভাব্য সরকার গঠনের জন্য দল ও দলের বাইরের দক্ষ ব্যক্তিদের কাজে লাগানো হবে। দেশের বাইরে অবস্থানরত অন্তত হাজারের বেশি সৎ ও দক্ষ পেশাজীবীকেও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ এ ধরনের দক্ষ কর্মী সরকারের কাজে লাগায় বলেও জানান তারা।
সরকার গঠনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ সক্ষমতা জামায়াতের রয়েছে। এ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারের সুযোগ নেই। সব সেক্টরের জন্য আমাদের দক্ষ লোক প্রস্তুত আছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ঘোষিত নির্বাচনি ঐক্যে কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম মাওলানা মামুনুল হক, মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, জুলাই বিপ্লবের তরুণ যোদ্ধা ও সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার নেতারা যুক্ত হয়েছেন।
নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারাই এতে যুক্ত থাকবেন। আর তরুণদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি নতুন কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আগেই নানা পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য সরকার গঠনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে ব্যাপক প্রস্তুতি ও তৎপরতা চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আভাস দিয়েছেন।