Image description

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ (সদর-সিটি) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। চরমোনাই পীরের সম্মানে বরিশাল-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি যে দুই আসনে (ঢাকা-১৩ ও বাগেরহাট-১ আসনে) প্রার্থী হয়েছেন, সেই দুই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী দেবে না।

এই তিন রাজনৈতিক দলে আসন ছাড় দেওয়ার মানসিকতাকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ বলছেন এটা রাজনৈতিক কৌশল। আবার কেউ বলছেন রাজনৈতিক শিষ্টাচার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো উচিত। কারণ, বর্তমানে রাজনীতিতে সৌজন্য কমে যাচ্ছে।

জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এই আসন ছাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাদের ভাষ্য, যারা যেখানে ছাড় দিচ্ছেন, তাদের অবস্থা ওই আসনে খারাপ। তাই লজ্জাজনকভাবে না হেরে ‘কৌশলগতভাবে’ রাজনৈতিক শিষ্টাচার দেখাচ্ছেন।

জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ (সদর-সিটি) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে নির্বাচন করবেন। এর মধ্যে বরিশাল-৫ আসনে তাকে লড়াই করতে হবে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের সঙ্গে। ফলে জামায়াতের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’। যে কারণে বরিশাল-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। একইভাবে বাগেরহাট-২ ও ঢাকা-১৩ আসনে মামুনুল হককে ছাড় দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। সেখানে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ‘ক্ষীণ’। এ কারণে তারাও ‘লজ্জাজনকভাবে না হেরে’ ‘রাজনৈতিক সৌজন্যতার’ পথ বেছে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, এই সমঝোতায় ইসলামী আন্দোলনের অনেক ভূমিকা ছিল। আমরা সেই ভূমিকা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। টুকটাক টেকনিক্যাল কিছু বিষয়ের জন্য তারা নিজেরা আলাদা নির্বাচনের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা নির্বাচনে তাদের সাফল্য কামনা করি। আর ইসলামী আন্দোলনের সম্মানে দলের সিনিয়র নায়েবে আমিরের আসনে আমরা কোনো প্রার্থী দেব না। কারণ, উনাদের আমির পীর সাহেব নির্বাচন করছেন না। তাই সৌজন্যের জন্য আমরা এই আসনে প্রার্থী দেব না।

এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের সম্মানে তার আসনে প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি যে দুই আসনে (ঢাকা-১৩ ও বাগেরহাট-১ আসনে) প্রার্থী হয়েছেন, সেই দুই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী দেবে না। এই দুই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী প্রত্যাহার করা হবে। দুই আসনেই ইসলামী আন্দোলনের সমর্থন মাওলানা মামুনুল হকের প্রতি থাকবে। ইসলামী রাজনীতিতে তার ত্যাগ ও অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অন্য কোনো দলের সঙ্গে যুথবদ্ধ পথচলার চিন্তা করছে না। যেসব আসনে দলের প্রার্থী নেই সেসব আসনে নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন জানাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চান। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এমন সৌজন্য খুব একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে জোট ভেঙে যাওয়ার পরও একে অপরের প্রভাবশালী নেতাদের আসনে প্রার্থী না দেওয়া একটি ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।’

তিনি বলেন, বিষয়টিকে কৌশলগত ছাড় যেমন বলা যায়, ঠিক তেমনি রাজনৈতিক শিষ্টাচারও বলা যায়। আমি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। পারস্পরিক সম্মান ও সৌজন্যের ভিত্তিতে আসন ছাড় দেওয়া ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চরমোনাই পীর ১১ দলীয় জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই জায়গা থেকে তার প্রতি সম্মানবোধ কাজ করেছে বলে মনে হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এর আগে, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে গত ১৬ জানুয়ারি প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিল দেখিয়ে জোট থেকে আলাদা হয়ে এককভাবে ২৬৮ আসনে প্রার্থী দেয় ইসলামী আন্দোলন। গতকাল দুটি আসন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ছাড় দেয়। এর একদিন আগে ইসলামী আন্দোলন ছাড়া ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে জোট। যেখানে জামায়াতের প্রার্থী ছিল ১৭৯। গতকাল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে একটি আসন ছাড় দিল।

এই জোটে বর্তমানে আছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।