ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের সময় বারবার বলেছিলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতাগ্রহণের পর আজ ২০ জানুয়ারি এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধে এখনো তিনি কিছুই করতে পারেননি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরে জুড়ি নেই। ভুল হোক আর ভুয়াই হোক—নিজের ‘সক্ষমতার’ ব্যাপারে তাঁর অগাধ আত্মবিশ্বাস।
ট্রাম্প নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, তাঁর ভক্তরা তো বটেই, অন্য সাদাসিধা মানুষও সহজেই তাঁর কথার ফাঁদে আটকে যান। তাঁর কথায় আস্থা রাখতে শুরু করেন।
এই যেমন ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে ট্রাম্প বড় গলায় বারবার বলে আসছিলেন, জো বাইডেনের জায়গায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বাধতই না।
একই কথার পুনরাবৃত্তি করে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘... এখনো যদি আমি প্রেসিডেন্ট হই, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই ভয়াবহ ও দ্রুত বাড়তে থাকা যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারি।’
২০২৩ সালের মে মাসে সিএনএনের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, ‘তাঁরা মারা যাচ্ছেন—রুশ ও ইউক্রেনীয়রা। আমি চাই, তারা (রাশিয়া–ইউক্রেন) মারা যাওয়া বন্ধ করুক এবং আমি এটা করে দেব। আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটা করে দেব।’

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারকালে ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাঁর কাছে আছে।
তখন এ পরিকল্পনার কিছুই প্রকাশ করেননি ট্রাম্প। তিনি তখন দাবি করেছিলেন, পরিকল্পনা আগেই প্রকাশ করে দিলে পরে তা কার্যকর হবে না।
সিএনএনে প্রকাশিত এক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে (২০২৩–২৪ সাল) অন্তত ৫৩ বার প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করবেন।
তবে তখনই বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্য রাজনৈতিক। এই যুদ্ধ ‘এক দিনে’ বন্ধ করা অসম্ভব।
নির্বাচনে জয়ের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি ট্রাম্প বলেছিলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর প্রথম কাজই হবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা।

২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে ফেরেন ট্রাম্প। ক্ষমতায় বসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি তিনি আগে বারবার দিয়েছিলেন, তা যে ফাঁকা বুলি ছিল, সেটি অচিরেই প্রমাণ হয়ে যায়।
ট্রাম্প গত বছরের মার্চে কেইথ কেলগকে ইউক্রেনবিষয়ক তাঁর বিশেষ দূতের দায়িত্ব দেন। কেইথ ১০০ দিনের মধ্যে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেও কোনো সমাধান আসেনি।
২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষভাগে টাইম সাময়িকীকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তিনি একসময় বলেছিলেন, ক্ষমতা বসার ‘প্রথম দিনেই’ রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করবেন।
তখন ট্রাম্প দাবি করে বসেন, তিনি আসলে কথাটা ‘সিরিয়াসলি’ (গুরুত্ব দিয়ে) বলেননি।
তবে ট্রাম্পের এই দাবি ছিল ডাহা মিথ্যা। কেননা, তিনি আগে সব সময়ই জোর গলায় বলে আসছিলেন, তাঁর কাছে ‘চমক’ আছে। ক্ষমতায় বসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হবে।

ট্রাম্প এবার মুখ রক্ষার ভিন্ন কৌশল নেন। তিনি দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের মধ্যে অকল্পনীয় ঘৃণা বিদ্যমান, যা শান্তিপ্রক্রিয়ার পথে প্রধান বাধা।
এ ছাড়া এই ইস্যুতে ট্রাম্প নানা সময় দ্বান্দ্বিক কথাবার্তা বলে আসছেন। যুদ্ধ বন্ধ করতে না পারার জন্য তিনি কখনো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দোষারোপ করেছেন। আবার কখনো তীব্র ক্ষোভ ঝেড়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।
অবশ্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প তাঁর মতো করে নানা চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। তিনি যেমন পুতিনের সঙ্গে কথা বলছেন, তেমনি আলোচনা করছেন জেলেনস্কির সঙ্গেও। কিন্তু তাঁর কোনো প্রচেষ্টাই এখন পর্যন্ত কার্যকর ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প এখন ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো অবকাশযাপনকেন্দ্রে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি বৈঠক করেন।

বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ৯০ শতাংশ বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়ে শতভাগ একমত হওয়া গেছে।
অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর খুব কাছাকাছ রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামবে কি না, তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বোঝা যাবে। সবকিছু ভালোভাবে এগোলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি হয়ে যাবে। আর তা খারাপভাবে এগোলে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
রাশিয়ার দাবি, যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইউক্রেনের পুরো দনবাস অঞ্চল মস্কোর কাছে ছেড়ে দিতে হবে। অঞ্চলটির বড় অংশ বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে। অঞ্চলটির ইউক্রেন–নিয়ন্ত্রিত বাকি অংশেরও দখল চায় মস্কো।
যেকোনো শান্তিচুক্তি করার ক্ষেত্রে রাশিয়ার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে। আর তা হলো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না ইউক্রেন। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, ন্যাটোতে ইউক্রেনকে নেওয়ার পক্ষে নন তিনি।

যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প যে শান্তি প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে দনবাস অঞ্চলটি পুরোপুরি রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবে ইউক্রেন একেবারেই নারাজ।
এ প্রসঙ্গে জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন যেকোনো মূল্যে শান্তি চায় না। তবে তাঁরা চান, এই যুদ্ধ শেষ হোক। কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইউক্রেনের বিনাশ তাঁরা চান না।
দনবাস নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে একটি সমঝোতা কঠিন বিষয় বলে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে কিয়েভভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান পেন্টা সেন্টারের প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো আল–জাজিরাকে বলেন, রাশিয়া যদি যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হতে না পারে, আর বুঝতে পারে যে কিয়েভ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হজম করতে সক্ষম, তখন মস্কো শান্তিচুক্তিতে রাজি হতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে ক্রেমলিন ও পুতিনের ব্যক্তিগত সম্মতির ওপর।
ভলোদিমির ফেসেনকোর মতে, যদি ২০২৬ সালে মস্কোর কাছে যুদ্ধের অচলাবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাহলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ একটি শান্তিচুক্তির আশা করা যেতে পারে। তেমনটা না হলে যুদ্ধ ২০২৭ সালে গড়াতে পারে।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় রুশ আগ্রাসন শুরু হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পূর্ণ হবে আগামী মাসে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্যমতে, ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ (এক-পঞ্চমাংশ) ভূখণ্ড এখন রাশিয়ার দখলে আছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে নিজ দখলে নেওয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপও আছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, তিনি মনে করেন, পুতিন শান্তিচুক্তি করতে প্রস্তুত। আর ইউক্রেন কম প্রস্তুত। শান্তিচুক্তি না হওয়ার জন্য তিনি জেলেনস্কিকেই দায়ী করেন।
যদিও ইউরোপীয় মিত্ররা বলছে, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে কিয়েভ নয়, বরং মস্কোর আগ্রহই কম।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভূরাজনৈতিক ও বৈশ্বিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ফোর্ডহ্যাম গ্লোবাল ফোরসাইটের প্রতিষ্ঠাতা টিনা ফোর্ডহ্যামের একটি উক্তি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি গত বছরের এপ্রিলে সিএনবিসির এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ শুরু করাটা সহজ, কিন্তু তা থামানো কঠিন।’
এই কথা যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে খুবই সত্যি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় বসার এক বছর পূর্ণ হলো আজ (২০ জানুয়ারি) মঙ্গলবার। এই ৩৬৫ দিনেও তিনি তাঁর সেই ‘২৪ ঘণ্টার’ কথাটি রাখতে পারলেন না।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, বিবিসি, সিএনবিসি, সিএনএন, রয়টার্স।