জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হতে যাচ্ছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। নতুন এ কাঠামোয় যুক্ত হচ্ছে একটি উচ্চকক্ষ। যেখানে ১০০ জন সদস্য মনোনীত হবেন প্রতিটি দলের ভোটের শতাংশ অনুসারে।
যদিও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও শরিক দল সংসদে নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের পক্ষে অবস্থানে ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামী দলসহ দেশের অনেক রাজনৈতিক দলের ভোটের শতাংশ অনুসারে উচ্চকক্ষের পক্ষে অবস্থান ছিল। বর্তমানে জোট নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে স্বস্তিজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। ভোটের হিসাব মেলাতে উচ্চকক্ষের সমীকরণে নির্বাচনি জোট গঠনে হিসাব মেলাচ্ছে কোনো কোনো দল।
তার মধ্যে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অন্যতম। শেষ মুহূর্তে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনি জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে ২৬৮ আসনে ভোট করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। তাদের টার্গেট উচ্চকক্ষ।
ইসলামী আন্দোলন সূত্র বলছে, জোটগতভাবে অর্ধশত বা তার চেয়ে কিছু বেশি আসনে ভোট করলে নিম্নকক্ষে দলের পক্ষে সদস্য থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। কিন্তু এককভাবে ২৬৮ আসনে নির্বাচন করলে যে ভোট হবে তা যোগ করলে উচ্চকক্ষে দলের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ অনেকটাই নিশ্চিত বলা যায়। সেই সমীকরণ থেকেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ইসলামী আন্দোলনকে জোটে ভেড়ানোর আশা এখনো ছাড়েনি জামায়াত।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির জোটের অন্যতম নেতা মাওলানা মামুনুল হককে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এদিকে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে ভোট করার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। ২০ জানুয়ারি শেষ হচ্ছে জোটে যাওয়া না-যাওয়ার সিদ্ধান্ত। ২১ জানুয়ারি বরাদ্দ হবে দলীয় প্রতীক।
জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ুম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত কয়েকটি জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে ভোটার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার পক্ষে ভোট বেড়েই চলেছে। আমরা আশা রাখছি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৬৮ আসনে ভোট করে ১০ থেকে ১২ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি পাবে। এই ভোট নিয়ে আমরা উচ্চকক্ষে ভালো অবস্থানে থাকব।
জামায়াতের সঙ্গে জোটে না থাকা প্রসঙ্গে বলেন, ইসলামী আদর্শের আলোকে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আসন্ন নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের ওয়ান বক্স পলিসি নির্মাণ করেছিলেন পীরসাহেব চরমোনাই। তাঁর এই ডাকে অনেকে সুর মিলিয়ে কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, এক পর্যায়ে এসে কেউ কেউ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য, ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ইসলামপন্থি শক্তির ওয়ান বক্স পলিসির ধারাকে ভিন্ন ধারায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এজন্য আমরা মর্মাহত। আমরা এককভাবেই ভোট করব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে জোট-মহাজোটের চিত্র-প্রতিচিত্র দেখা যাচ্ছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রতিদিন বিভিন্ন জেলার দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে কথা বলছেন তারেক রহমান। দলীয় প্রার্থীর স্বার্থে নির্বাচনে সহযোগিতার অনুরোধ করে বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে তাদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দিচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান। তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর বিদ্রোহী প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছেন। আর যারা প্রত্যাহার করেননি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারির মধ্যে তাদের অধিকাংশই প্রত্যাহার করবেন বলে আশা করছেন। এতে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে দলটি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমঝোতা না হওয়ায় নির্বাচনি সমীকরণ অনেকটাই বদলে যেতে পারে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে ভোটের মাঠে নামায় অনেক আসনেই এখন বহুমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তারা কোনো ধরনের সমঝোতায় না গিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির পরীক্ষায় নামতে যাচ্ছেন। জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, উচ্চকক্ষ বর্তমানে ভোটের সমীকরণে নতুন যাত্রা করেছে। ২০০১ সালের পর থেকে নির্বাচনে ভোটের শতাংশ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। বর্তমানে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল যোগ হয়েছে। নতুন ভোটার যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে উচ্চকক্ষ নিয়ে নতুন নতুন সমীকরণ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো ও জোটের মধ্যে।
সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আসন বণ্টন করা হয়েছে : আসন সমঝোতা সম্মিলিত সিদ্ধান্তে করা হয়েছে। কাউকে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। গতকাল জামায়াতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আসন সমঝোতা, রাজনৈতিক আলোচনা কিংবা পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষকেই অসম্মান বা চাপ প্রয়োগ করা হয়নি; বরং সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, বাস্তবতা ও সম্মান বজায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ‘মনোনয়নপত্র দাখিলের পরও কিছু বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাকি থাকায় পর্যায়ক্রমে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে লিয়াজোঁ কমিটি মাঠের বাস্তবতা, দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীর পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অবস্থানসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে একাধিক জরিপের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় আট থেকে দশটি জরিপ বিশ্লেষণ করা হয়।’
অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, ‘কিছু আসন এক দফায় ঘোষণা করা হলেও কয়েকটি বিষয়ে মতভিন্নতা থাকায় সময় নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে। গত কয়েক দিনে দীর্ঘ বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়গুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসন বণ্টন ছিল সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ফল, কাউকে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সহানুভূতি জানাতেই ওই সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেখানে জাতীয় সরকার গঠন বা এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনার মূল বিষয় ছিল বেগম জিয়া যে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তা নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অব্যাহত রাখা।’ জামায়াতের বিরুদ্ধে শরিয়াহ আইন চালুর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও কূটনৈতিক প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে দলের আমির স্পষ্ট করে বলেছেন বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই দেশ পরিচালিত হবে। এ বিষয়ে কোনো দ্ব্যর্থতা নেই।’
ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে জুবায়ের বলেন, ‘এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জোট ছিল না; বরং সংস্কার দাবিকে সামনে রেখে আটটি আন্দোলনরত দলের একটি নির্বাচনি ঐক্য প্রক্রিয়া ছিল। এখানে কোনো আহ্বায়ক বা স্থায়ী কাঠামো ছিল না, সভাপতিত্ব ও বক্তব্যও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হয়েছে, যা একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ।’
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ‘অসম্মানজনক’ আচরণের অভিযোগের বিষয়ে জুবায়ের বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট নেতার অসুস্থতা ও ভুলে যাওয়ার কারণে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে যে কষ্ট হয়েছে, সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। মানুষ হিসেবে এ ধরনের ভুল হতে পারে। এর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে আমরা দুঃখ প্রকাশ করেছি। একে অবজ্ঞা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’ ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে সরে দাঁড়ালেও আলোচনার পথ এখনো খোলা আছে বলে মনে করে জামায়াত। জুবায়ের বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের এখনো সময় বাকি। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব যাতে ইসলামি দল এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকে। লিয়াজোঁ কমিটি ও শীর্ষ নেতৃত্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’
অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে এবং বাকি আসনগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। আমরা ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেব। সামনে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আসন বণ্টনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ১৬ বছরের ক্ষতি কাটিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। সৌজন্য ও শালীনতা রক্ষা করে একটি ইনক্লুসিভ রাজনীতির সংস্কৃতি গড়াই জামায়াতের মূল লক্ষ্য।’