Image description
শরিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া

শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটে না থাকা এবং এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসলামী আন্দোলনের অংশগ্রহণ ছাড়াই ২৫৩টি আসনে সমঝোতার ভিত্তিতে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বলছে, ইসলামের মৌলিক নীতির প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর অস্পষ্ট অবস্থান এবং রাজনৈতিক আস্থাহীনতার কারণে তারা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় থাকছে না। এ কারণে ২৬৮টি আসনে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচন করবে। বাকি ৩২ আসনেও দলটি আদর্শিক বিবেচনায় কোনো না কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানাবে। এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের শীর্ষ নেতারা মনে করেন, ইসলামী আন্দোলনের জোটে না থাকার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং আসন্ন নির্বাচনে তা বড় প্রভাব ফেলবে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসলামী আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের আসন সমঝোতার বিষয়টি ঘোষণা করেন। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত আসনগুলোতে ঐক্যভুক্ত দলগুলোর একক প্রার্থী থাকবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৭৯টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, এবি পার্টি ৩টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২টি আসনে প্রার্থী দেবে।

জোটের পক্ষ থেকে আসন সমঝোতার ঘোষণা আসার পরদিনই সংবাদ সম্মেলনে করে এই জোটে না থাকার ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল কালবেলাকে বলেন, ইসলামী আন্দোলনের জোটে থাকা না থাকার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। যদি শেষ পর্যন্ত না আসে, তাহলে নতুন দল যুক্ত হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো অপেক্ষা করতে হবে ১৯ ও ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। ইসলামী আন্দোলনের মূল আপত্তি কী নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ইসলামী আন্দোলনই বলতে পারবে। আর যার যার ভোট সে করবে, প্রভাব জনগণের মেরূকরণের ওপর নির্ভর করবে। এগুলো কোন দিকে আলটিমেটলি যায়, এটা এত আগে প্রেডিক্ট করা যাবে না। তবে আমরা আশাবাদী এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত যে সুযোগ আছে এর মধ্যে যে কেউ আসতে পারে, অন্যরাও যদি রিভিউ করেন, সে সুযোগ আছে। বাকি ৪৭টি আসনের বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমরা তো সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারও খালি রেখেছি। তার মানে আমরা সম্মান দিয়েছি।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেত্রীর বরাত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং চলাকালেই তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। গাজী আতাউর রহমান ‘আল্লাহর আইন ও ইসলামী আদর্শ থেকে জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন দিকে চলে গেছে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, তাও সঠিক নয়। আমরা মনে করি, জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন। জামায়াতে ইসলামী আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর আদর্শের আলোকে পরিচালিত একটি ইসলামী সংগঠন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সব সময় রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আচরণ করে থাকে। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ আমরা করি না। জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এমন বক্তব্য প্রদান করা থেকে বিরত থাকার জন্য আমি গাজী আতাউর রহমানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

গতকাল এনসিপি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এমনটি হবে আশা করিনি। একসঙ্গে নির্বাচনে যাব, সে প্রত্যাশা ছিল। তারপরও তাদের জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর এনসিপি জোটের প্রিন্সিপাল অনুসরণ করবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১১ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ায় এনসিপির কোনো প্রভাব নেই। তিনি বলেন, ১০ দলীয় জোটের ওপর মানুষের আস্থা আছে। প্রত্যাশা করছি, সামনের দিনগুলোয় এই ঐক্য জনগণের ম্যান্ডেড নিয়ে জয়ী হবে। আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের নেতৃত্বে জোটের শরিক হবে বলে আশাবাদী এনসিপি। তা নাহলে এনসিপির আসন বাড়বে বলে প্রত্যাশা করি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে এনসিপির আলোচনা হয়েছে।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক (এলডিপি) পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ কালবেলাকে বলেন, দেখেন প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের স্বাধীনতা রয়েছে নিজস্বভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। তারা যদি মনে করে এককভাবে নির্বাচন করে তারা লাভবান হবে এতে আমাদের আপত্তি থাকার কোনো কারণ থাকতে পারে না। ইসলামী আন্দোলনে সরে যাওয়ায় জোটের নির্বাচনে প্রভাব পড়বে কি না, জানতে চাইলে অলি আহমদ বলেন, অমি মনে করি না, কোনো সমস্যা হবে। তবে জোটে এলে তারাই লাভবান হতো। বাকি ৪৭টি আসনের বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী মূল দল। উনাদের লোক আছে সব জায়গায়। তারাই ঠিক করবেন। এলডিপি আর কোনো আসন চাইবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, না এ মুহূর্তে আমাদের চাওয়ার তো আর সময় নেই।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের কালবেলাকে বলেন, ইসলামী আন্দোলন যেন জোটে থাকে সেজন্য আমরা কম চেষ্টা করিনি। আমি নিজেও চেষ্টা করেছি। তাদের কারও কারও আগ্রহ ছিল; কিন্তু বেশিরভাগেরই আগ্রহ দেখায়নি। তাদের কিছু অভিযোগ আছে, আমাদেরও আছে। তবে ইসলামী আন্দোলনের ধারণা হচ্ছে—এবার জামায়াত সরকার গঠন করে ফেলবে। ফলে তাদের কোনো মূল্যায়ন থাকবে না। এটা তাদের বড় আশঙ্কা। এ মুহূর্তে বিশেষ কিছু বলার নাই। তবে ইসলামী আন্দোলন জোটে না আসায় নির্বাচনে কিছু আসনে প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন। জোটের বাকি ৪৭টি আসনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা আবারও আলোচনা করব, তারপর সিদ্ধান্ত হবে। দেখা যাক আরও সময় আছে। কিছু আসনে জোটের প্রার্থীদের মধ্যেই উন্মুক্ত নির্বাচন হবে।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু গতকাল কালবেলাকে বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেষ মুহূর্তে ১১ দলীয় ঐক্যে না থাকা এবং পৃথক নির্বাচনের ঘোষণার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। ইসলামী আন্দোলনের প্রধান চরমোনাই পীর সাহেব শুরু থেকেই ইসলামিক দলগুলো ও দেশপ্রেমিক পক্ষদের নিয়ে জোটের কথা বলেছিলেন। পরে এক বাক্স নীতির বিষয়টিও বেশ আলোচিত হয়। এ ঐক্যে তাদের যুক্ত না হওয়ার কারণে অবশ্যই প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ধর্মীয় চিন্তার এক বাক্স নীতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমি মনে করছি।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার কালবেলাকে বলেন, ১১ দলীয় জোটে ইসলামী আন্দোলন না আসায় কিছুটা প্রভাব তো পড়বেই। তবে আশা করি, ব্যাপকভাবে অসুবিধা হবে না। ঠিক কি কারণে ইসলামী আন্দোলন জোটে থাকল না—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা তো তারাই বলতে পারবে। তবে থাকলে খুব ভালো হতো।

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান আনোয়ারুল হক চান কালবেলাকে বলেন, আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো দল হিসেবে তো প্রত্যেকের নিজস্ব আইডিওলজি আছে। যেহেতু ইসলামী আন্দোলন একটি রাজনৈতিক দল, তাদের অবশ্যই নিজস্ব একটা দর্শন আছে। সে হিসাবে তারা তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, জোটে আসবে না। আমরা ওটাকে সম্মান করি এবং তাদের চিন্তাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। আর রাজনৈতিক হিসাবটা তো শুধু নির্বাচিত হবো এবং পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে আমার বিবেচনায় থাকবে না, এরকম বিষয়ে কিছু করতে গেলেও তো ভবিষ্যতে আরও সমস্যাটা বাড়বে। তিনি বলেন, আলোচনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমি জড়িত ছিলাম; কিন্তু অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় তাদের মাধ্যমে আমাদের সামনে এসেছে। তবে আমরা আশায় ছিলাম, অপেক্ষায় ছিলাম, হয়তোবা সবকিছু কনসিডার করে তারা জোটে আসবেন। আমাদের দিক থেকে কোনো কমতি ছিল না। তবে ইসলামী আন্দোলন জোটে না থাকায় খুব বেশি প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।