সংস্কারের পক্ষে ভোট হলে ব্যালটে দিতে হবে ‘হ্যাঁ’, বিপক্ষে হলে ‘না’। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে-
- প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা
- নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা জোরদার
- বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা
- প্রশাসনে দলীয়করণ কমানো
- মৌলিক অধিকার ও ভোটাধিকার সুরক্ষা।
সরকারের বক্তব্য, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসন বা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ঝুঁকি কমবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল আলোচিত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট। এই গণভোটে জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দল প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ, পথসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছে দলগুলো।
সরকার ইতোমধ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তবে বিএনপি গণভোটে হ্যাঁ অথবা ‘না’ ভোটের পক্ষে স্পষ্ট কোনো অবস্থান না নেয়ায় নির্বাচনের আগেই রাজনীতি কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি গণভোট নয়- বরং আগামী দিনের রাষ্ট্রকাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের লড়াই।
কী নিয়ে এই গণভোট
‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক সংশোধনী প্রস্তাবে জনগণের সম্মতি যাচাই করতেই এই গণভোট। সংস্কারের পক্ষে ভোট হলে ব্যালটে দিতে হবে ‘হ্যাঁ’, বিপক্ষে হলে ‘না’।
প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে-
- প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা,
- নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা জোরদার,
- বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা,
- প্রশাসনে দলীয়করণ কমানো,
- মৌলিক অধিকার ও ভোটাধিকার সুরক্ষা।
সরকারের বক্তব্য, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসন বা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ঝুঁকি কমবে।
সরকারের প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আহ্বান জানাচ্ছেন। ঐকমত্যের কমিশনের সদস্যরাও বিভিন্ন সভা ও কর্মশালায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন।
গত সোমবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ইমামদের নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগঠনের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাবে।’
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ভবিষ্যতে আর হাসিনার মতো কর্তৃত্ববাদী শাসন তৈরি হবে না। আগামী ৫০ বছরের রাষ্ট্রপথ এই ভোটেই নির্ধারিত হবে।”
১১ দলের সমন্বিত কৌশল
গত ৮ ডিসেম্বর জামায়াতসহ আন্দোলনরত আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দেশব্যাপী প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরে এনসিপিসহ আরো কয়েকটি দল যুক্ত হয়ে জোটটি ১১ দলে পরিণত হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘এই সংস্কার মানে দুর্নীতি, ফ্যাসিজম ও দলীয়করণকে না বলা। এটি বিচার, ভোটাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে জাতির ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত।’ তিনি বলেন, জনগণের ‘হ্যাঁ’ ভোটের মধ্য দিয়েই একটি বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত হবে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “স্বৈরাচারকে ‘না’ বলুন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন।”
বিএনপির ভিন্ন অবস্থান ও রাজনৈতিক মেরুকরণ : ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকগুলোতেই বিএনপির আপত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, গণভোটের প্রশ্ন ও প্রস্তাবনাগুলো রাজনৈতিকভাবে একতরফা এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীনদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। ফলে তারা হ্যাঁ বা ‘না’ ভোট কোনো পক্ষে মত দিচ্ছেন না। দলের নেতারা বলেছেন তাদের প্রধান এজেন্ডা হলো জাতীয় নির্বাচন- এটিই হবে প্রধান ফোকাস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ও গণভোট একসাথে হওয়ায় ভোটার আচরণে প্রভাব পড়তে পারে। একটি অংশ সংসদ নির্বাচনের চেয়েও গণভোটকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, আবার আরেক অংশ একে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছে।
গণভোট আলোচনায় আনার দাবি : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান সিইসির সাথে বৈঠক শেষে বলেন, ‘নির্বাচনের আলোচনায় গণভোট প্রায় হারিয়ে গেছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত গণভোটের পক্ষে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।’ তিনি আশঙ্কা করেন, পর্যাপ্ত প্রচার না হলে ভোটাররা গণভোটের গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হতে পারেন।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা দলগতভাবে এবং জোটগত দুভাবেই ‘হ্যা’ এর পক্ষে রয়েছি। আমরা আমাদের দলীয় ফোরাম এবং যেখানেই যাচ্ছি জনগণকে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করছি। আমরা জনগণকে বলছি যদি আপনারা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চান, ঘুণে ধরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চান, যদি ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন চান তাহলে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিন।
খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী নয়া দিগন্তকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের একইদিনে গণভোটের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। একটি বড় দল গণভোট ভেস্তে দিতে চাচ্ছে। আবার সরকারও তেমন তৎপরতা দেখাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনায় ভাটা পড়েছে। অথচ নতুন ব্যবস্থায় গণভোট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানুষ পরিবর্তন চায় কী চায় না তা স্পষ্ট হবে গণভোটে। কিন্তু একইদিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় গণভোটের গুরুত্ব কমে গেছে। প্রার্থীদের বিজয়ী করতে গিয়ে মানুষ গণভোট নিয়ে তেমন কোনো তৎপরতা দেখাবে না। যা গণভোটের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। খেলাফত আন্দোলন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, গণভোট নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের কোনো ধরনের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠক করে আমরা গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচারণার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলাম; কিন্তু তারা দায়সারা মনোভাব দেখাচ্ছে। যা দেশ ও জাতির জন্য খুবই ক্ষতিকর। গণভোটে যদি হ্যাঁ জয়যুক্ত না হয় তাহলে আমরা দেশের যে পরিবর্তন চাই তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা দলের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের বলে দিয়েছি তারা নিজেদের মার্কার পাশাপাশি যেন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচারণা করেন এবং আমাদের প্রার্থীদের যে প্রচারপত্র থাকবে তার একপাশে প্রার্থীর প্রতীক এবং অপর পাশে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান হবে বলেও তিনি জানান।
বিশ্লেষণ : একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এতে একদিকে যেমন ভোটার উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে নির্বাচনী উত্তেজনায় গণভোটের বিষয় চাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে।
জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলের সক্রিয় মাঠপর্যায়ের প্রচারণা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও বিএনপির নীরব বিরোধিতা গণভোটকে কার্যত রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষার মঞ্চে পরিণত করেছে। ফলে এই গণভোট কেবল সংস্কার প্রশ্নে নয়- বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শন ও ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক রেফারেন্ডামে রূপ নিচ্ছে।