ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৫৩ জন প্রার্থীর কাছে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে । তাঁদের প্রায় এক - তৃতীয়াংশ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ( বিএনপি ) প্রার্থী । এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী , জাতীয় পার্টি , ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও লাইসেন্সের বিপরীতে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে । বিএনপির ছয়জন ও জামায়াতে ইসলামীর একজন প্রার্থীর একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে । সর্বোচ্চ পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও তাঁর স্ত্রীর নামে । লাইসেন্স করা এসব আগ্নেয়াস্ত্র নির্বাচনের আগেই প্রার্থীদের জমা দিতে হবে ।
প্রার্থীরা বলছেন , নির্বাচনের আগেই জমা দেওয়া হবে বলে এসব আগ্নেয়াস্ত্র ভোটে কোনো প্রভাব ফেলবে না । নির্বাচন কমিশন ( ইসি ) বলেছে , লাইসেন্স থাকা আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করবে । আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের তথ্য পাওয়া গেছে । ওই হলফনামায় প্রার্থীরা আয়, সম্পদ, মামলা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি নিজের ও স্বামী / স্ত্রীর নামে লাইসেন্স থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ও ধরন উল্লেখ করেছেন ।
আজকের পত্রিকা শুধু মনোনয়নপত্র যাচাই - বাছাইয়ে বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করেছে । এই বিশ্লেষণে মাইক্রোসফট এক্সেল সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে । নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী , ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ৩০০ আসনে মোট ৩ হাজার ৪০৬ টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন আগ্রহীরা । তবে জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৬৮ টি মনোনয়নপত্র । এর মধ্যে বিএনপি , জামায়াতে ইসলামী , জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ( এনসিপি ) ৫১ টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৯০ জন এবং স্বতন্ত্র ৪৭৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন । যাচাই - বাছাই শেষে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৮৪২ টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয় । মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার দিনে মোট ৪৬৯ জন প্রার্থী আপিল করেছেন । আজ শুক্রবার আপিলের শেষ দিন ।
আগামীকাল শনিবার থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫ টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি । গোয়েন্দা সংস্থা বলছে , এসব অস্ত্র অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে । হত্যা , ডাকাতি , ছিনতাই , চাঁদাবাজি ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের একাধিক ঘটনায় পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে । ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব অস্ত্র ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পুলিশ কর্মকর্তারা । অভিযান চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও অস্ত্র - গুলি উদ্ধার না হওয়ায় তা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে ।
পুলিশের মহাপরিদর্শক ( আইজিপি ) বাহারুল আলমও বলেছেন , পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়াটা উদ্বেগের । দেশে গত এক বছরে হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য বেড়েছে । এ সময়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে শতাধিক মানুষকে । বিভিন্ন ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে আরও আড়াই শতাধিক মানুষ । পুলিশ বলছে , এসব অপরাধের বেশির ভাগে ব্যবহৃত হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে থানা ও পুলিশি স্থাপনা থেকে লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র ।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের তথ্য বলছে , ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র- জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা , ফাঁড়ি ও পুলিশের অন্যান্য স্থাপনায় হামলা , ভাঙচুর , লুট , অগ্নিসংযোগ করা হয় । পুলিশের এসব স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৫৩ টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২ টি গোলাবারুদ লুট হয় । গণভবন এলাকা থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের ( এসএসএফ ) ৩২ টি অস্ত্রও খোয়া যায় । পরবর্তী সময়ে অভিযানে অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার হলেও ১ হাজার ৩৩৫ টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯ টি গুলি উদ্ধার করা যায়নি । অপারেশন ডেভিল হান্ট চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র- গুলি বেহাত রয়ে গেছে ।
বর্তমানে অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় পর্ব চলছে । নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র অস্ত্রের মালিক ১৫৩ প্ৰাৰ্থী আপিলের ওপর শুনানি শুরু হবে । মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায় , তাঁদের ১৫৩ জন লাইসেন্সের বিপরীতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্য দিয়েছেন । দলভিত্তিক হিসাবে দেখা যায় , সবচেয়ে বেশি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বিএনপির প্রার্থীদের , ৯২ জনের ।
এরপর জাতীয় পার্টির ১২ জনের , জামায়াতে ইসলামীর চারজনের , ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাঁচজনের , বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের দুজনের , গণঅধিকার পরিষদের দুজনের এবং স্বতন্ত্র ২৮ জন প্রার্থীর কাছে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে । বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকা অপর আট প্রার্থী অন্যান্য দলের । লাইসেন্সধারীদের মধ্যে ১১ জনের বয়স ৫০ বছরের কম । সর্বকনিষ্ঠ হলেন গণঅধিকার পরিষদের পটুয়াখালী -১ আসনের প্রার্থী মো . শহিদুল ইসলাম ফাহিম । তাঁর বয়স ২৮ বছর । জেলাওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা যায় , ৫২ জেলার প্রার্থীদের কাছে লাইসেন্সের বিপরীতে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে । সবচেয়ে বেশি কুমিল্লা জেলার প্রার্থীদের কাছে । এই জেলার ১২ জন প্রার্থীর কাছে বৈধ অস্ত্র রয়েছে । ঢাকার ১০ জনের , নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের আটজন করে , চাঁদপুরের সাতজন , বরিশালের ছয়জন এবং বগুড়া , নরসিংদী , চট্টগ্রাম ও কুড়িগ্রামে পাঁচজন করে প্রার্থীর কাছে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ।
আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারী ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে পেশায় ব্যবসায়ী ১০৫ জন । আইনজীবী পাঁচজন , সাবেক সরকারি কর্মচারী তিনজন , রাজনীতিবিদ দুজন , ব্যবসা আইনজীবী একজন , কৃষি ও অন্যান্য পেশার একজন , ব্যবসা ও কৃষিতে যুক্ত ১১ জন , ব্যবসা ও সাবেক সরকারি কর্মচারী একজন , রাজনীতি ও ব্যবসায় যুক্ত দুজন , ব্যবসা ও চিকিৎসা পেশার একজন , রাজনীতি , ব্যবসা , শিক্ষকতা ও আইনজীবী — এই চার পেশায় যুক্ত একজন , রাজনীতি ও অন্যান্য পেশার একজন , শিক্ষকতা পেশার দুজন , চিকিৎসক দুজন এবং অন্যান্য পেশার আটজন প্রার্থী রয়েছেন । জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন , নির্বাচনের আগে বৈধ অস্ত্র জমা দিতে হবে । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ - সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করা হয় ।
লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র আছে যাঁদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে , ঢাকা -৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও তাঁর স্ত্রীর নামে পাঁচটি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে । একই দলের কক্সবাজার -১ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে রয়েছে লাইসেন্স করা তিনটি অস্ত্র । কুমিল্লা অঞ্চলের বিএনপির প্রায় সব আসনের প্রার্থীর কাছেই লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে । তাঁদের মধ্যে কুমিল্লা -১ আসনের প্রার্থী ড . খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আছে একটি রিভলবার ও একটি শটগান । চাঁদপুর -১ আসনের আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও তাঁর স্ত্রীর রয়েছে চারটি অস্ত্র ।
নরসিংদী -২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ড . আবদুল মঈন খানের রয়েছে দুটি দোনলা বন্দুক । সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নেত্রকোনা - ৪ আসনের প্রার্থী মো . লুৎফুজ্জামান বাবরের রয়েছে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র । জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ -৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো . হারুনুর রশীদ বলেন , ১৯৯৬ সাল থেকে তাঁর অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে । প্রয়োজন হলে নিরাপত্তার জন্য কাছে রাখেন । তিনি বলেন , “ আমাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল । সরকার ভোটের আগে অস্ত্র জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিলে জমা দেব । এ নিয়ে নির্বাচনে প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই ।
'জামায়াতে ইসলামীর চারজন প্রার্থীর অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে । তাঁরা হলেন টাঙ্গাইল -৬ আসনের এ কে এম আব্দুল হামিদ , ঢাকা -৭ আসনের মো . এনায়াত উল্লা , পিরোজপুর -১ আসনের মাসুদ সাঈদী এবং যশোর -৩ আসনের মো . আব্দুল কাদের । তাঁদের মধ্যে মো . এনায়াত উল্লার রয়েছে একটি শটগান , একটি রিভলবার ও একটি রাইফেল । ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী , টাঙ্গাইল -৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী , ব্রাহ্মণবাড়িয়া -২ আসনের রুমিন ফারহানা , ভোলা -১ আসনের আন্দালিব রহমান পার্থ এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরসহ ( জি এম কাদের ) আরও কয়েকজন প্রার্থীর লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে ।
জানতে চাইলে টাঙ্গাইল -৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম আব্দুল হামিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন , তিনি নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই আগ্নেয়াস্ত্র রেখেছেন । এর বাইরে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করবেন না । এই অস্ত্র নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলতে ব্যবহার হবে না । সরকারি নির্দেশনা পেলে অস্ত্রটি জমা দেবেন ।
সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করা হয় । মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান । হাদিকে গুলি করার ঘটনায় সম্ভাব্য প্রার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় । নির্বাচনের আগে প্রার্থী , রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় । নির্বাচনে তাঁদের নিরাপত্তার জন্য ‘ গানম্যান ’ ও ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলা হয় ।
নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় সরকার ইতিমধ্যে রাজনৈতিক নেতা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে । অনেকেই গানম্যান কিংবা ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন । এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের জন্য গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে । জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ( আইজিপি ) নুরুল হুদা আজকের পত্রিকাকে বলেন , একজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে পারেন । তবে গানম্যান বা দেহরক্ষী দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় । তাঁর মতে , নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয় । তবে যাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে , তাঁর প্রকৃত ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি ।