Image description
জনমনে অস্বস্তি

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের ধরতে দেশে চলছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে। তবে তাতে স্বস্তি ফিরছে না সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রতিদিনই হচ্ছে খুনাখুনি, গুলি বা বোমার শব্দে আতঙ্কিত হচ্ছে মানুষ। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি, সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধীদের দুর্ধর্ষতা তা জানান দিচ্ছে। অন্যদিকে বেড়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি, যা নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে অস্বস্তি বাড়িয়েছে।

গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ১২ ফেব্রুয়ারি এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে তপশিল ঘোষণার পরের দিনই রাজধানীতে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। সে ঘটনার এক মাস না পেরোতেই গত বুধবার রাতে ফের রাজধানীতে গুলি করে হত্যা করা হয় জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে। চাঞ্চল্যকর এ দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুলি করে হত্যার আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। নতুন বছর শুরুর পর গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত ৯টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে গত সোমবার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে যশোরের মনিরামপুরে এক ব্যবসায়ীকে, চট্টগ্রামের রাউজানের সিকদারপাড়ায় এক যুবদল নেতাকে এবং নরসিংদীতে আরেক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভয় দেখাতে বা আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি নিক্ষেপের মতো ঘটনাও ঘটছে। রাজবাড়ীতে চিহ্নিত সন্ত্রাসী জামিনে বের হয়ে কারাগারের সামনেই এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। গত ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে ছাত্রদলের সাবেক এক নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগ আছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরেও গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। অল্পের জন্য তিনি প্রাণে বাঁচলেও তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি করা প্রয়োজন, এ জায়গায় দৃশ্যমান ঘাটতি আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভোটের মাঠে সেটার প্রভাব পড়বে।

 
 

অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, সম্প্রতি সংঘটিত হত্যা ও গুলির ঘটনাগুলো সবই রাজনৈতিক নয়। হাদি হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক হলেও বেশিরভাগ ঘটনা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে ঘটেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক যেসব হত্যা হয়েছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন। একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পৃক্ত নয়। এসব ঘটনা বছরজুড়েই কমবেশি ঘটে থাকে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কারণে অনেক হচ্ছে, তা এখনই বলা যাবে না। তবে খুনের মতো ঘটনাগুলো যে কারণেই ঘটুক, জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। পুলিশসহ অন্য বাহিনীগুলো অপরাধ দমনে আরও বেশি কার্যকরভাবে তৎপর আছে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

পুলিশের কর্মকর্তারা তথ্য দিয়ে বলছেন, গত ২৬ দিনে দুই শতাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ ১৫ হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১ থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযানে ২০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আর গ্রেপ্তার হয়েছে ১৭১ জন। অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি ১৪৯ রাউন্ড বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ, ১০টি ককটেলসহ ধারালো অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।

অভিযান চললেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে মনে করছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা কালবেলাকে বলেন, রক্তক্ষয়ী এক অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর নির্বাচন হচ্ছে। এবারের পরিস্থিতি অন্য সময়ের মতো নয়। আমাদের সহিংসতা বেড়েছে এটা সত্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতদের পরিবর্তিত পরিস্থিতি মাথায় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গত মঙ্গলবার নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সদস্য সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা নির্বাচনকেন্দ্রিক দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখছি না। আগে যেরকম ছিল সেরকমই দেখা যাচ্ছে। ইসিকে আমরা এই কনসার্ন জানিয়েছি যে, মাঠ পর্যায়ে আরও বেশি উপস্থিতি এবং আরও সক্রিয় কার্যক্রম চালাতে হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশের পাঁচ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার আটটি গোলাবারুদ লুট হয়। গত দেড় বছরে ৪ হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো প্রায় দেড় হাজার অস্ত্র বেহাত অবস্থায় আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বোরের দুই লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৬টি গুলির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল, তবে তাতে এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অনেক দুর্ধর্ষ বন্দি পালিয়ে যায়। তাদের মধ্যে এখনো অধরা ৭১০ জন। এ তালিকায় হত্যা মামলার দণ্ড পাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে অনেক অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও তাদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়াচ্ছে। তা ছাড়া অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগার থেকে বেরিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। এতে তাদের শিষ্যরা নানা অপরাধ করার মতো সাহস দেখাচ্ছে। পুলিশের বড় একটা অংশ পেশাদার এসব অপরাধীকে আইনের আওতায় নিতে না পারলেও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে বেশি সময় পার করছে। পাশাপাশি এরা যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখতে হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, অবৈধ অস্ত্র আছে, লুট হওয়া অস্ত্র আছে। পুলিশ বা গোয়েন্দাদের কাছে এসব অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য নেই। তথ্য থাকলে আরও আগেই এসব উদ্ধার করা সম্ভব হতো। এখন এসব অস্ত্র যাতে ব্যবহার না হয়, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিটকে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আস্থার জায়গায় না যাওয়ায় সম্প্রতি অনেক রাজনীতিবিদ ও নির্বাচনী প্রার্থীদের অনেকে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। গোপালগঞ্জ-৩

(কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী এস এম জিলানীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, যেখানে তিনি নেতাকর্মীদের দেখাচ্ছেন, তিনি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে আছেন। গত বুধবার স্থানীয় একটি মতবিনিময় সভায় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে বলেন, আমাদের জীবনের হুমকি আছে, এটা সত্য। দেখেন, এখনো বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে আছি। জানি না কখন কী হয়, তাই সতর্ক থাকি।’ এস এম জিলানী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি করা প্রয়োজন, এই জায়গায় দৃশ্যমান ঘাটতি আছে। নির্বাচনের মতো বড় রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সব অপরাধ বাস্তবতার একটা সংযোগ আছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় রাজনৈতিক আয়োজনে যে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটার প্রভাব নির্বাচনে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভোটের মাঠে সেটার প্রভাব পড়বে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স বিভাগের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. রেজাউল করিম কালবেলাকে বলেন, পুলিশ তার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছে। আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের আগে আরও অস্ত্র উদ্ধার হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।