Image description
সারা দেশে এক বছরে ৩৭৬৭ খুন

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। খুনের বেশির ভাগের নেপথ্যে রয়েছে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আছে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির সরাসরি হস্তক্ষেপ। এর উদ্দেশ্য হলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করা। এর বাইরেও একটি শক্তি আছে, যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা চেয়েছিলেন বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও এমপি প্রার্থীকে হত্যা করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে। কিন্তু হাদির খুনিরা দ্রুত শনাক্ত হওয়ার কারণে তারা বেশিদূর এগোতে পারেননি। তবে এ ঘটনার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ ভূমিকায় তা মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু থেমে নেই টার্গেট কিলিং। সবশেষ বুধবার রাতে রাজধানীর তেজতুরি বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত এক বছরে সারা দেশে তিন হাজার ৭৬৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকায় মাসে গড়ে ২০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে খুন বেড়েছে ৩২৭টি। ২০২৪ সালে সারা দেশে তিন হাজার ৪৪০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনা থাকায় ওই বছরের আগস্ট মাসে হত্যা মামলা হয় অনেক বেশি। এ সংখ্যা ছিল ৬২৬টি। আগের বছর আগস্টে হত্যা মামলা হয় ৪৪১টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ২৭৬, নভেম্বরে ২৭৯, অক্টোবরে ৩১৯, সেপ্টেম্বরে ২৯৭, আগস্টে ৩২১, জুলাইয়ে ৩৬২, জুনে ৩৪৪, মে মাসে ৩৪১, এপ্রিলে ৩৩৬, মার্চে ৩১৬, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০ এবং জানুয়ারিতে ২৯৪টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে দেশের বিভিন্ন থানায়। গত ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এ সংখ্যা ৬৭টি। ওই মাসে রংপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় কোনো খুনের ঘটনা ঘটেনি। তবে ডিএমপিতে ওই মাসে ২০টি, সিএমপিতে দুটি; কেএমপি, জিএমপি ও আরএমপিতে চারটি করে; বিএমপি ও এসএমপিতে দুটি করে, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ১২টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৪৪টি, সিলেট রেঞ্জে ১৯, খুলনা রেঞ্জে ২৩, বরিশাল রেঞ্জে ১১, রাজশাহী রেঞ্জে ২৩, রংপুর রেঞ্জে ২৬ এবং রেলওয়ে রেঞ্জে তিন হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। ডিএমপিতে গত এক বছরে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে সেগুলোর মধ্যে জানুয়ারিতে ২০, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ১৮, এপ্রিলে ২২, মে মাসে ২৩, জুনে ১৮, জুলাইয়ে ১৬, আগস্টে ২২, সেপ্টেম্বরে ১৯, অক্টোবর ও নভেম্বরে ১৮টি করে এবং ডিসেম্বরে ২০টি ঘটনা আছে।

ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীতে মাসে গড়ে ১৯-২০টি খুনের ঘটনা ঘটে। পারিবারিক কলহ, পূর্বশত্রুতার জের, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক কারণেও ঘটে খুনের ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত প্রায় শতভাগ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনসহ জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। সম্প্রতি সময়ে অন্য যেসব টার্গেট কিলিং হয়েছে সেগুলোর নেপথ্য কারণ জানতে চাইলে পুলিশ কমিশনার বলেন, একেকটি একেক কারণে হয়েছে। নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে হাদিকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে অপতৎপরতা অব্যাহত রাখছে। সূত্রাপুরে তারিক সাইফ মামুন হত্যা, বাড্ডায় মামুন শিকদার হত্যা, পল্লবীতে যুবদল নেতা কিবরিয়া, গুলশান ও মোহাম্মদপুরে দুই ছাত্রদল নেতা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রদল নেতা এবং মিটফোর্ডের সামনে ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা থাকলেও হাদি হত্যার মতো সুপরিকল্পিত ঘটনা কোনোটি ছিল না।

তফসিল ঘোষণার পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ-সদস্য প্রার্থী ওসমান হাদিকে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। গত ১৭ নভেম্বর রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয় এর আগে চট্টগ্রামে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে তাকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটে। গত ১১ নভেম্বর একই দিনে মাত্র আট ঘণ্টার ব্যবধানে ছাত্রদলের দুই নেতার লাশ উদ্ধার করা হয়। একজনের লাশ গুলশানে, অন্য জনের লাশ মোহাম্মদপুরে পাওয়া যায়। ১৬ নভেম্বর খুলনার করিমনগরে আলাউদ্দিন মৃধাকে তার বাড়ির ভেতর গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৫ জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশে সংঘটিত শরৎ চক্রবর্তী মণির খুনের ঘটনাটি বেশ আলোচিত। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন ছোট-বড় নেতা হত্যার শিকার হয়েছেন। এসবের বেশির ভাগই ‘টার্গেট কিলিং’।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, তেজতুরি বাজারের ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ও এলাকার আধিপত্য বিস্তারের জেরে। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। আগের ঘটনাগুলোর রহস্য আমরা বের করেছি। জড়িতদের আইনের আওতায় এনেছি। এই ঘটনাও রহস্য বের হবে। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা খুনিদের চেহারা শনাক্ত করেছি। এখন খুনিদের নাম-পরিচয় বের করার চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, হাদি হত্যার ঘটনাটি ছিল পুরোপুরো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য। এখানে অন্য কিছু নেই। রাজনৈতিক ব্যক্তি নিহত সংক্রান্ত অন্যান্য ঘটনায় রাজনীতির বাইরে বেশকিছু কারণ আছে। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেন আর কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে আমরা তৎপর আছি।