Image description

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সরগরম। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন নির্ধারণ হওয়ায় প্রধান দলগুলো তাদের চূড়ান্ত ছক কষতে শুরু করেছে। নির্বাচনে জয় পেতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে জোট গঠন, ভাঙন এবং আসন ভাগাভাগির তীব্র দরকষাকষি। মাঠের ‘প্রধান শক্তি’ বিএনপি এবং শক্তি সঞ্চয় করা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতা আগামীর রাজনীতির নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্ভাব্য বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশেষ করে ভোটের আগে ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় পর্যন্ত পর্দার আড়ালে এবং প্রকাশ্যে নানামুখী মেরূকরণ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল আশঙ্কা-আপত্তির কথা এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘হতাশাজনক’ উল্লেখ করে কোনো কোনো দলের নেতারা বলেছেন, আবারও কোনো পাতানো নির্বাচনের আয়োজন করা হলে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন।

জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে মরিয়া সব রাজনৈতিক দল। সেজন্য নানামুখী কৌশল অবলম্বন আর হিসাব কষে এগোচ্ছে দলগুলো। এবারের নির্বাচন শুধু দুই প্রধান শিবিরের লড়াই নয়, বরং রাজপথের পুরোনো মিত্রদের মধ্যেও ক্ষমতার সুষম বণ্টনের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্দার অন্তরালে চলছে নানা সমীকরণ, যেখানে ছোট-বড় সব দলই নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দিতে মরিয়া। একদিকে কোনো কোনো দলের সভাপতি বা সেক্রেটারি নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে এসে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর কয়েকটি দলের নেতারা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন। ফলে বিএনপি সাংগঠনিক ভিত্তিকে আরও বিশাল আকারে রূপ দিচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন সমমনা ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতাও চূড়ান্তের পথে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট দলের প্রার্থীরা একে অন্যকে সমঝোতার ভিত্তিতে ছেড়ে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকা সাধারণ মানুষের নজর এখন দলগুলোর জোট গঠনের রাজনীতির দিকে। তবে শেষ পর্যন্ত এ নতুন জোট কিংবা অন্য দল বিলুপ্তির রাজনীতি সাধারণ ভোটারদের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বিএনপি এবার এককভাবে বা সমমনাদের নিয়ে সরকার গঠনের ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী। এ আত্মবিশ্বাস থেকে তারা বেশকিছু ছোট দলকে নিজেদের প্রতীকে (ধানের শীষ) নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতারা নিজেদের দল বিলুপ্ত বা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তারা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ছাড়া আগামীতে সরকার গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন জরিপের ফলেও বিএনপি অনেকটা আশাবাদী বলে জানা গেছে।

গত সোমবার বেসরকারি সংস্থা অ্যামিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) একটি জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। জরিপে ৭০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা বিএনপিকে ভোট দেবেন। ১৯ শতাংশ বলেছেন, তারা জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন। এনসিপিকে ভোট দেবেন ২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ।

এ জরিপের ফলে বিএনপিতে কিছুটা স্বস্তি বিরাজ করছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী শিবিরে ভিন্ন চিত্র। তারা মনে করেই এই ধরনের জরিপ নিরপেক্ষ নয়, বরং একটি দলের অ্যাসাইনমেন্ট।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান কালবেলাকে বলে, যারা জরিপ করেছে, সেটি একান্ত তাদের নিজস্ব ব্যাপার। বিএনপি বিশ্বাস করে জনগণের শক্তিতে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। নিশ্চয় সুষ্ঠু ভোট হলে জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। কেননা, জনগণ অতীতে বিএনপির শাসনামল এবং উন্নয়ন দেখেছেন। বিশেষ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উন্নয়ন তারা দেখেছেন।

ইএএসডির জরিপের বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার কালবেলাকে বলেন, ‘জরিপটি মনে হয়েছে একটি দলের অ্যাসাইনমেন্ট। তা ছাড়া বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ জরিপ নয়। অতীতে কিছু বিদেশি সংস্থা জরিপ করেছে, যেগুলো তুলনামূলক নিরপেক্ষ। ইএএসডির জরিপে মনে হয়েছে তারা জনমতকে ভিন্নদিকে নিতে চায়।’

এদিকে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের জন্য বিএনপি এখন পর্যন্ত ১৬টি আসন ছাড় দিয়েছে। এর মধ্যে সাতজন ধানের শীষে, বাকিরা নিজেদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করবেন। ধানের শীষ প্রতীক নিশ্চিত করতে চারটি দলের শীর্ষ নেতারা নিজেদের দল বিলুপ্ত করে নেতাকর্মীসহ বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। দুটি দলের মহাসচিব দল ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে নির্বাচন করতে গত ৮ ডিসেম্বর ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন। তাকে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে প্রার্থী করেছেন বিএনপি। এরপর ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিলে তাকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপি চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ আসনে ধানের শীষে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। নিবন্ধিত দল এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজও ধানের শীষ পেতে কৌশলে এগোচ্ছেন। তাকে এরই মধ্যে ঢাকা-১৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বিএনপি।

এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করলেও নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (একাংশ), গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নিজ দলে নির্বাচন করছে। এর মধ্যে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ ভোলা-১ (সদর) আসনে ‘গরুর গাড়ি’ প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই মধ্যে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’র তিন শীর্ষ নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না (বগুড়া-২), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক (ঢাকা-১২) এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬) আসনে প্রার্থী করেছে বিএনপি। মান্না দলীয় প্রতীক কেটলি, সাইফুল হক কোদাল ও জোনায়েদ সাকী মাথাল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। পাশাপাশি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ সিলেট-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, নীলফামারী-১ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দলীয় প্রতীক খেজুরগাছ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। এ ছাড়া এ দলের আবদুর রহিম ইসলামাবাদীর নেতৃত্বাধীন অংশের নেতা মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসন ছাড় দেওয়া হয়েছে। তিনি ধানের শীর্ষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে। গণঅধিকার সভাপতি নুরুল হক নুর (পটুয়াখালী-৩) দলীয় ট্রাক প্রতীকে এবং সেক্রেটারি রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দিয়ে (ঝিনাইদহ-৪) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন। অন্যদিকে, কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যুক্ত হয়েছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে নানামুখী তৎপরতায় এগোচ্ছে দলটি। তাদের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোটে সবশেষ যুক্ত হয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। গত সেপ্টেম্বর থেকে অভিন্ন কয়েকটি দাবিতে যুগপৎভাবে আন্দোলন শুরু করে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা আটটি দল। জামায়াত ছাড়াও অন্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস। সর্বশেষ এবি পার্টিসহ মোট তিনটি দল যুক্ত হয়ে এ জোটে দলের সংখ্যা ১১টি।

জানা গেছে, ১১টি দল সর্বসম্মতভাবে প্রতিটি আসনে একজন করে প্রার্থী ঘোষণা করবে। যেই দলের যেখানে ভালো অবস্থান, সেই আসনে ওই দলের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। যদিও এখনো আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। তবে কবে নাগাদ হবে, সেটিও নিশ্চিত করে কেউ বলছেন না। অবশ্য আলোচনার পর্যায়েই আছে। তথ্যমতে, জামায়াত ১১০টি আসনে সমঝোতার বিষয়ে আগ্রহী। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩৫ থেকে ৪০, এনসিপি ৩০, খেলাফত মজলিস ১৫, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১০, এবি পার্টি তিন, এলডিপি তিন, বিডিপি দুই, জাগপা তিন, খেলাফত আন্দোলন চার এবং নেজামে ইসলাম পার্টি দুটি আসনে। তবে দলগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত করা হয়নি। দলীয় জোটের ৬০০-এর বেশি প্রার্থী ৩০০ আসনের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছেন।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, আসন সমঝোতার বিষয়ে এখনো আলোচনা অব্যাহত আছে। আমরা চেষ্টা করছি একটি ফলপ্রসূ সমাধানের।