বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পৈতৃক জেলা বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের ৯টি জেলা সফরে যাচ্ছেন। সড়কপথে আগামী রোববার থেকে শুরু হওয়া চার দিনের এই সফর শেষ হবে ১৪ জানুয়ারি। জেলাগুলো হলো—টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও লালমনিরহাট। সফর ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা চেয়ে এরই মধ্যে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। সফরকালে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত কোনো নির্বাচনী আচরণবিধি যাতে লঙ্ঘন না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবে বিএনপি।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সফর মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ। সফরে তারেক রহমান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শহীদ আবু সাঈদ, তৈয়বা মজুমদারসহ জুলাই যোদ্ধা ও দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের কবর জিয়ারত করবেন। পাশাপাশি মা বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিলেও অংশ নেবেন। এ ছাড়া সফরকালে তিনি আহত জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
এদিকে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারিয়ে নেতাকর্মীরা এখনো শোকে মুহ্যমান। দীর্ঘদিন পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এই সফর ঘিরে তারা নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন। সফর ঘিরে জেলাগুলোতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রস্তুতি সভা, সমন্বয় সভা করছেন নেতারা।
দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় পর গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরেন তারেক রহমান। এর পাঁচ দিনের মাথায় মাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন তিনি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশ ও জাতির স্বার্থে সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। নিয়মিত রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অফিস করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। এবার তিনি ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন। তারেক রহমানের এই সফর সংক্রান্ত সমন্বয়ক করা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন গণিউল আজমকে, যিনি সম্প্রতি তারেক রহমানের নিরাপত্তা টিমে পরিচালক (সমন্বয়) হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, ১১ জানুয়ারি রোববার সকালে ঢাকার গুলশান অ্যাভিনিউয়ের বাসা থেকে রওনা হবেন তারেক রহমান। সড়কপথে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ হয়ে বগুড়ায় যাবেন। সেখানে রাতযাপন করবেন তিনি। পরদিন ১২ জানুয়ারি বগুড়া থেকে রংপুরের পীরগঞ্জ হয়ে দিনাজপুর যাবেন। সেখান থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে যাবেন এবং সেখানে রাতযাপন করবেন। ১৩ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও থেকে পঞ্চগড়, নীলফামারী ও লালমনিরহাট সফর করবেন। সেখান থেকে ফিরে রংপুরে রাতযাপন করবেন। শেষ দিন ১৪ জানুয়ারি রংপুর থেকে বগুড়া (গাবতলী) হয়ে ঢাকায় ফিরবেন।
তারেক রহমান এবারই প্রথম ঢাকা-১৭ এর পাশাপাশি বগুড়া-৬ আসন থেকেও নির্বাচন করছেন। কালবেলার বগুড়া ব্যুরোপ্রধান জানান, দেশে ফেরার পর তারেক রহমানের নির্বাচনী এলাকায় প্রথম আগমন ঘিরে চলছে নানান প্রস্তুতি।
সদ্যপ্রয়াত খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় গণদোয়ায় অংশ নেবেন তিনি।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, প্রায় ১৯ বছর পর বগুড়ায় বাপ-দাদার ভিটা ও নির্বাচনী এলাকায় আসছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বগুড়ায় তার আগমনের খবরে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উচ্ছ্বসিত দলের নেতাকর্মীরা। তাকে বরণ করে নিতে অপেক্ষায় বগুড়াবাসী। নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে দলীয় কার্যালয়। পরিষ্কার করা হচ্ছে তার সম্ভাব্য অবস্থানস্থল। গণদোয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে বগুড়া সেন্ট্রাল হাইস্কুল মাঠ।
বগুড়া জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন কালবেলাকে জানান, বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত গণদোয়ায় তারেক রহমান অংশ নেবেন।
গতকাল বুধবার দুপুরে বগুড়া জেলা বিএনপির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তারেক রহমানের জন্য একটি কক্ষ সংস্কার করা হচ্ছে। জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেনসহ নেতাকর্মীরা কাজের তদারকি করছেন। তারা জানান, আগে থেকেই তারেক রহমানের জন্য নির্ধারিত একটি কক্ষ ছিল। পার্টি অফিসে এলেই তিনি ওই কক্ষে বসতেন। দীর্ঘদিন ধরে কক্ষটি জরাজীর্ণ ছিল। এখন কক্ষটি আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।
তারেক রহমান এর আগে বগুড়ায় এলে শহরের সূত্রাপুরে তার বাসায় উঠতেন। সাবেক সংসদ সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু বলেন, তারেক রহমান কোথায় রাতযাপন করবেন, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে সূত্রাপুরের বাসাটি প্রস্তুত করে রেখেছি। আগে উনি ওই বাসাতেই রাতযাপন করতেন।
বিএনপির মিডিয়া সেলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সমন্বয়কারী কালাম আজাদ বলেন, তারেক রহমান বগুড়া থেকে রংপুর যাওয়ার পথে জুলাই আন্দোলনে শহীদ তিন পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন। সেইসঙ্গে জুলাই আন্দোলনের রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, তারেক রহমানের আগমন ঘিরে ঠাকুরগাঁও জেলার সর্বস্তরের বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। জেলা বিএনপির নেতারা জানান, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ রায়হানুল হাসান, আল মামুন, সাহান পারভেজ ও রাকিবুল হাসানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং খালেদা জিয়ার স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণ করতেই ঠাকুরগাঁও সফরে আসছেন তারেক রহমান।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, তারেক রহমান ১২ জানুয়ারি রাতে সড়কপথে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছাবেন। নির্দিষ্ট সময় এখনো নিশ্চিত না হলেও তিনি ওই রাতে শহরের ব্যুরো বাংলাদেশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (গেস্ট হাউস) রাতযাপন করবেন। পরদিন ১৩ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে তিনি জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নিহত ‘শহীদ’ আল মামুনের কবর জিয়ারত করবেন। চার শহীদের কবর ভিন্ন স্থানে হওয়ায় সময় ও কর্মসূচির সীমাবদ্ধতার কারণে আল মামুনের কবরে শ্রদ্ধা জানানো হবে বলে জানিয়েছে জেলা বিএনপি। এরপর বেলা ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে (বড় মাঠ) অনুষ্ঠিতব্য খালেদা জিয়ার স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে অংশ নেবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কর্মসূচি শেষ করে একই দিন তিনি পার্শ্ববর্তী জেলা পঞ্চগড়ের উদ্দেশে রওনা হবেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলী বলেন, তারেক রহমানের এই সফর ঠাকুরগাঁওয়ের জন্য ঐতিহাসিক। এর আগে ২০০৩ সালে শীতকালে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কম্বল বিতরণ কর্মসূচিতে তিনি এখানে এসেছিলেন। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবার তার আগমন নেতাকর্মীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের।
রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের ধানের শীষের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, তারেক রহমানকে বরণে সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি যেন লঙ্ঘন না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থেকে বড় কোনো আয়োজন করা হচ্ছে না।
এদিকে, সিরাজগঞ্জের অনুষ্ঠান নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ অন্যরা বলেন, যাত্রার শুরুতেই উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জ জেলায় সদ্যপ্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত দোয়া মাহফিলে অংশ নেবেন তারেক রহমান। যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় মহাসড়ক থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পাইকপাড়া এলাকায় অবস্থিত বিসিক শিল্প পার্কে দুপুর আড়াইটায় এ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।