আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা-১০ আসনে ভোটের উত্তাপ বাড়ছে। জমজমাট হয়ে উঠেছে ভোটের লড়াই। প্রধান প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের বিধি মেনেই নিয়মিত নির্বাচনী প্রচার করছেন। ভোটারদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রতীক নিয়ে ২১শে জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করবেন প্রার্থীরা।
রাজধানীর ধানমণ্ডি-কলাবাগান ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ভোটের লড়াইয়ে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এবং জামায়াতও সমমনাদের জোটের প্রার্থী। এই আসনে বর্তমান এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ প্রার্থী হচ্ছেন এমন আলোচনা থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে নেই। বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীর বাইরে আলোচনায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী। এই তিন প্রার্থীকে ঘিরে চলছে নির্বাচনী হিসাবনিকাশ।
নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন কর্মী- সমর্থকরা। বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভোটারদের বার্তা দেয়া হচ্ছে। দুই দলের প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সভা- সমাবেশ করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এর বিপরীতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেও এলাকাভিত্তিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সরজমিন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ভোট নিয়ে নানা হিসাব আছে। দিন ঘনিয়ে আসলে এই হিসাব আরও পরিষ্কার হবে। আসনটিতে জাতীয় পার্টি, এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস প্রার্থী দিলেও ভোটের মাঠে তাদের তৎপরতা এখনো তেমন দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় পার্টির প্রার্থী কিছু জায়গায় ঘরোয়া বৈঠক করছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ঘিরে এই প্রার্থী কাজ করছেন বলে ভোটারদের অনেকে জানিয়েছেন।
এই আসনে বিএনপি’র পক্ষ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবি। স্থানীয়ভাবে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং বার বার কারা নির্যাতিত হয়েছেন। এলাকায় দীর্ঘ দিন থেকেই নির্বাচনকেন্দ্রিক কাজ করে আসছেন। রবি বিএনপি ও সমমনা দলের সমর্থন নিয়ে ভোট করছেন।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এডভোকেট মো. জসিম উদ্দিন সরকার। জামায়াতের এই আইনজীবী নেতা আদালত অঙ্গনে পরিচিত মুখ। এই আসনে জামায়াত ও সমমনা জোটের একাধিক প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনী সমঝোতা হলে জসিম উদ্দিন সরকারই হবেন এই জোটের একক প্রার্থী।
এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মো. আব্দুল আউয়াল, জাতীয় পার্টির বহ্নি বেপারি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আহমদ আলী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির আবুল কালাম আজাদ, এবি পার্টির ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা, মুক্তিজোটের মো. আনিছুর রহমান প্রার্থী হয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের আলোচনা ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে ভোটার উপস্থিতি ও ভোট বিভাজনই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে। বিএনপি নগর ভোট ব্যাংককে শক্তিশালী করতে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দলটি ঘরোয়া সভা, ভোটার সংযোগ ও প্রচারণা জোরদার করে তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের কাছে প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে জামায়াত নির্দিষ্ট এলাকায় কর্মী সক্রিয়তা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের ভোটব্যাংক মজবুত রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক ও আদর্শিক ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে নানা তৎপরতা দেখা গেছে।
ধানমণ্ডি স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে শফিকুল ইসলাম নামের একজন ভোটার বলেন, আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি নিয়মিত এলাকায় থাকবেন এবং মানুষের কথা শুনবেন। অপরিচিত কাউকে ভোট দিতে চাই না। শুধু আমি নই এই আসনের ধানমণ্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট ও হাজারীবাগের ভোটাররা এবার প্রার্থী নয়, বরং নাগরিক সেবা, দ্রব্যমূল্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের ওপর ভোট দেবেন। নগর শিক্ষিত ভোটারদের উপস্থিতিই এই আসনের ফলাফল প্রভাবিত করবে।
পান্থপথের ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এখনো ভোট নিয়ে কিছু ভাবছি না। সুষ্ঠু ভোট হলে ভোট কেন্দ্রে যাবো। তবে কম ভোটার উপস্থিতি হলে জামায়াতের নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া আদর্শভিত্তিক ভোটারদের সমর্থন জামায়াতের শক্তির জায়গা। আর আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট যারা বেশি পাবেন তাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি। জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোট পাবে। কিছু কিছু ভোটার এমন কথাই বলছেন। আবার বিএনপি প্রচারে এগিয়ে আছে। তাদের প্রার্থীও জনপ্রিয়। সব বিবেচনায় বিএনপি-জামায়াত একটা লড়াই হতে পারে। তবে আসন সমঝোতা হলে ভোটের ফল পাল্টে যাবে। তখন বিএনপি’র ৩ থেকে ৪টি দলের সঙ্গে একা লড়তে হবে।
ধানমণ্ডি ১৫ নম্বরে কথা হয় হাফিজুর রহমান নামের এক ভোটারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা প্রথমে নিরাপত্তা চাই। ভোটকেন্দ্রে যাবো। তবে কাকে ভোট দিবো এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। বিএনপি’র প্রার্থী পরিচিত ব্যক্তি। অন্যরা যাদের প্রার্থী করেছেন তাদের ধানমণ্ডির কেউ চেনেন না। তারপরেও জামায়াত মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছে। আমাদের বাড়িও এসেছে। আবার বিএনপি’র ভোটার সংখ্যা এখানে বেশি। আওয়ামী লীগেরও অনেক নীরব ভোটার আছে। তাদের ভোটও একটা ফ্যাক্টর হবে।
আলী হোসেন সামদানি নামের এক ব্যক্তি বলেন, এই আসনের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সমঝোতা এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার ওপর। সেই হিসেবে বিএনপি যাকে প্রার্থী করেছেন সেই এগিয়ে থাকবেন। কারণ তিনি ধানমণ্ডি এলাকায় সুপরিচিত ব্যক্তি। আর এই এলাকায় অনেক ধনী মানুষের বসবাস। তারা ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ভুল করবেন না। অন্য দলগুলোর প্রার্থীকে ভোটাররা চিনে বলে মনে হয় না। তাহলে একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে কেউ ভোট দিবে না- এটাই স্বাভাবিক।
রায়েরবাজার এলাকার ভোটার সোহেল রানা বলেন, ১৫ বছর এই আসনে বিএনপিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন রবিউল ইসলাম রবি। এখানে শেখ ফজলে নুর তাপসের প্রভাবে কেউ বিএনপি’র নাম নিতে পারতেন না। সেখান থেকে শত শত কর্মী নিয়ে বিএনপি’র সভা-সমাবেশে যেতেন রবি। তাই তিনি বেশ পরিচিত মুখ। আর জামায়াতের প্রার্থী যাকে দেয়া হয়েছে তিনি এলাকায় কম পরিচিত। তবে তিনি এখন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সিকদার নাজিউর রহমান নামের একজন ভোটার বলেন, বিএনপি- জামায়াত লড়াই হবে। এখানে উঁচু শ্রেণির ভোটার বেশি। তাই তাদের প্রথম শর্ত নিরাপত্তা। আমাদের বসবাসের নিরাপত্তা যারা দিতে পারবে তাদেরই ভোট দিবো। তবে এখন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা বহুবার ভোট চাইতে এসেছেন। রবি এলাকার ছেলে আবার জামায়াত নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। দেখা যাক কী করি- এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
ঝিগাতলার মোসলেম উদ্দিন নামের একজন ভোটার বলেন, এখানে আওয়ামী লীগের একটি ভোট ব্যাংক আছে। তাপসের অনেক অনুসারী এখনো এলাকায় আছেন। তাদের ভোট কোনদিকে যায় বলা মুশকিল। তবে আওয়ামী লীগের ভোট যদি জাপা পেয়ে যায় তাহলে জাপা’র প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপি’র লড়াই হবে। তখন জামায়াতের প্রার্থী গুরুত্ব পাবে না। ভোট যদি বিভক্ত হয়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ফাতেমা রুশদির নামে একজন ভোটার বলেন, আওয়ামী লীগের ভোট কোনদিকে যায় বলা যায় না। তবে বিএনপি’র একক ভোট অনেক। জামায়াত যদি আওয়ামী লীগের ভোট পেয়ে যায় তবে তারা চমক দেখাবে। আর আমাদের এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তারপরেও একটি নির্বাচিত সরকার এলে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে। নারী ভোটারদের মধ্যেও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। গৃহিণী ও কর্মজীবী নারীরা চান, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে যিনি নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন তাকেই ভোট দিবো।