জুলাই বিপ্লবী ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী ‘ইনকিলাব মঞ্চ’র আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীকে চিহ্নিত করেছে মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। বাপ্পী ও তার নির্দেশে হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনের নামে মামলার চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে।
এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র আলোচনা চলছে, কে এই বাপ্পী? ওসমান হাদিকে ন্যক্কারজনকভাবে হত্যার এই পরিকল্পনা বাপ্পী কেবল নিজেই করেছেন? নাকি পেছনে আরও কোনো ‘রাঘব-বোয়াল’ জড়িত। বিশেষ করে শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী মোটরবাইক চালক আলমগীরকে যেভাবে ভারতে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে, তাতে আরও কোনো চক্র বা গোষ্ঠীর ‘ছায়া’ হিসেবে ভূমিকা রাখার সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, শরিফ ওসমান হাদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি সভা-সমাবেশে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক ও জোরালো বক্তব্য রাখতেন। তার এসব বক্তব্যে ছাত্রলীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়।
ডিবিপ্রধান জানান, সার্বিক তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়।
তার ভাষ্যে, ১৭ আসামির মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাঁচজন পলাতক রয়েছে। পলাতকরা হলেন- হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ, হত্যার নির্দেশদাতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ফয়সাল-আলমগীরকে পালাতে সহায়তা করা মানবপাচারকারী ফিলিপ স্নাল ও ফয়সালের বোন জেসমিন।
বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন মামলার আসামি বাপ্পী, পিটিয়েছিলেন যাকে-তাকে
তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। তিনি আওয়ামী লীগ আমলেই ছিলেন বেপরোয়া। তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন মামলা ছিল তখনই। এছাড়া এইচএসসির ছাত্রী, নারীসহ যাকে-তাকে পেটানো ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
সূত্র মতে, জীবনের শুরুতে বাপ্পী ছিলেন লেগুনা স্ট্যান্ডের লাইনম্যান, পরে দায়িত্ব পালন করেন চাঁদা আদায়কারীর। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের কয়েক বছরের মাথায় রাজনীতির ছায়ায় নাটকীয়ভাবে বদলে যায় তার জীবনের গতিপথ। এর বছর দশেকের মধ্যে আলিশান বাড়ি, একাধিক তৈরি পোশাক কারখানা, বিলাসবহুল গাড়ি, নামে-বেনামে অন্তত ২০টি প্লট ও ফ্ল্যাট, নিজস্ব জমিতে গড়ে তোলা মার্কেট—সব মিলিয়ে গড়ে তোলেন বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য। সরকারি ও বেসরকারি জমি দখল, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ঝুট ব্যবসার মাধ্যমে একসময় রাস্তায় ‘গড়ানো’ বাপ্পী ‘রাজা’ বনে যান।
সূত্র জানায়, ওয়ার্ড পর্যায়ের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পরে পল্লবী থানা যুবলীগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পরই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। এলাকায় ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা তাইজুল ওরফে ঝুট বাপ্পী লাইসেন্সধারী অস্ত্র ও নিজস্ব নিরাপত্তাবেষ্টিত বহর নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে বেড়াতেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এইচএসসি পরীক্ষার্থী এক তরুণীকে জনসম্মুখে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী রূপনগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (জিডি) দায়ের করেন। এ জিডি তুলে নিতে তাকে কয়েক দফা হুমকি দেন বাপ্পী। পরে ওই শিক্ষার্থী জিডি তুলে নিয়ে আপসনামায় স্বাক্ষর করেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় যুবলীগ তখন তাকে বহিষ্কার করে। পরে আবার সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক নারী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত এক বিরোধের জেরে তার বাবা ও ভাইকে রূপনগর আবাসিক এলাকার ২৩ নম্বর রোডের ওপরে বেধড়ক পেটান বাপ্পী ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তখন তিনি দৌড়ে এসে বাপ্পীর পায়ে ধরলে ওই যুবলীগ নেতা তাকেও চড়থাপ্পড় ও লাথি মেরে রাস্তার ওপর ফেলে দেন। সেই ঘটনার আপস করার জন্য ডেকে বাপ্পী পরে তাদের গুলি করে হত্যারও হুমকি দেন।
একই বছরের নভেম্বরে পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় করা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হন কাউন্সিলর বাপ্পী। ডিএমপির তৎকালীন বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক এসএম রাইসুল ইসলাম আদালতে ওই চার্জশিট দেন।
মামলা অনুসারে, ২০২০ সালের ২৮ জুলাই গভীর রাতে পল্লবী থানার পুলিশ কালশী কবরস্থানে অভিযান চালিয়ে রফিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও মোশাররফ হোসেন নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল, চারটি গুলি ও ‘একটি যন্ত্র’ পাওয়া যায়। পরে তাদের থানায় নিয়ে ওই যন্ত্রটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় বিস্ফোরিত হয়। এতে চার পুলিশ সদস্য ও এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী গুরুতর আহত হন। ২৯ জুলাই পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলা করা হয়।
চার্জশিট অনুসারে, ওই ঘটনায় জড়িত ছিলেন তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে ভারত থেকে ওই যন্ত্রে র্যাপিং করে চারটি বোমা ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু পল্লবী থানার তৎকালীন ওসির সঙ্গে আলোচনাকালে অস্ত্র-বোমার সূত্র গোপন করে যান বাপ্পী।
এছাড়া ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরেও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় বাপ্পীর নাম আলোচনায় আসে। তখন দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক তার সম্পদের তালিকা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিলেও পরে তা এগোয়নি।
ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী জুলাই বিপ্লবী ওসমান হাদিকে গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে গুলি করে মোটরসাইকেলে আসা ফয়সাল করিম মাসুদ। গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমান হাদি মারা যান। গুলি করার পর শুটার ফয়সাল ও তাকে বহনকারী মোটরসাইকেলের চালক আলমগীর শেখ ভারতে পালিয়ে যায়।
হাদিকে গুলির ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় একটি মামলা করেন। পরে ২০ ডিসেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা) ধারা সংযোজনের নির্দেশ দেন।