Image description

সবাইকে অশ্রুসিক্ত করে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তবে তিনি সর্বস্তরের মানুষের যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়া পেয়েছেন এ রকমের ভাগ্য অতীতে কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আপোসহীন ও ত্যাগী আন্দোলন, রাজনীতিতে র্শিষ্টাচার, দেশপ্রেম, সততা, একাগ্রতা, দল পরিচালনায় বলিষ্ঠ নেতৃত্বসহ অনেক ব্যতিক্রমী ও অনুসরণীয় নজির রেখে গেছেন। তবে বেগম খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম হলো, মৃত্যুকালে তিনি একজনও শত্রু বা সমালোচক রেখে যাননি। এ রকমের নজির সম্ভবতঃ বাংলাদেশে তো নয়ই, সারা বিশে^ কোনো রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবশেষে চরম প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাও ভূয়সী প্রশংসা করতে বাধ্য হলেন বেগম খালেদা জিয়ার। এ সবই সম্ভব হয়েছে গণতন্ত্রের প্রতি একাগ্রতা এবং অনন্য দেশপ্রেমের কারণেই।

গৃহবধূ থেকে গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে উঠলেন
১৯৮১ সালের ৩০মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয় তখন খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা। জিয়াউর রহমান পরবর্তী দলের হাল কে ধরবেন সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। বিএনপি নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন। আব্দুস সাত্তারের বয়স তখন আনুমানিক ৭৮ বছর। তৎকালীন সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আব্দুস সাত্তারকে পছন্দ করতেন। কারণ, তারা জানতেন, সাত্তারের রাজনৈতিকভাবে দক্ষ নন, শারীরিকভাবে দুর্বল। তখন দলের একটি অংশ চেয়েছিল কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বের কাঠামো ঠিক করা হোক। কিন্তু অপর আরেকটি অংশ, যারা রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারে ছিলেন, তারা সেটির বিরোধিতা করেন। বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তাঁর ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা, বইতে লিখেছেন, সামরিক এবং শাসকচক্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার জন্য খালেদা জিয়াই সে সময় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হতে পারতেন। কিন্তু তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আব্দুস সাত্তারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হলো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ চেয়েছিলেন, সাত্তার প্রেসিডেন্ট হোক। বিষয়টি নিয়ে তখনকার বিএনপিতে মতভেদ দেখা দেয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেনা প্রধানের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়েছে।
বিএনপি’র ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়া আত্মপ্রকাশ করেন। সেদিন তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সাথে খালেদা জিয়াও উপস্থিত ছিলেন। ১৯৮২ সালের ২১শে জানুয়ারি বিএনপি’র চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। দলের মধ্যে তখন এনিয়ে বিভক্তি। দলের তরুণ অংশ চেয়েছিল খালেদা জিয়া দলীয় প্রধান হোক। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে বিএনপি’র প্রধান হিসেবে দেখতে আগ্রহী ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। বিএনপির চেয়ারম্যান হবার জন্য একই সাথে প্রার্থী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।

বিএনপির ওয়েবসাইটে তখনকার ঘটনা বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার দুবার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় যান। বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবের কথা জানান। এসময় বিচারপতি সাত্তার বেগম খালেদা জিয়াকে দলের সহ-সভাপতির পদ এবং দেশের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু বেগম জিয়া ব্যক্তিগত কারণে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।”

১৯৯২ সালের ২৪শে মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তখন রাজনীতিতে সাত্তারের আর কোন মূল্য থাকেনি। তাঁর বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণে দল থেকে তিনি আড়ালে পড়ে যান। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপির এক বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন। কিন্তু তৎকালীন বিএনপির কিছু নেতা সেটি পছন্দ করেননি। বিএনপির সেই অংশটি ভিন্ন আরেকটি জায়গায় বৈঠকের আয়োজন করে। সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কয়েক মাস পরেই খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন।

এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছিল তখন বিএনপির বাইরে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে খালেদা জিয়াকে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এক্ষেত্রে হায়দার আকবর খান রনো এবং রাশেদ খান মেনন ছিলেন অন্যতম। খালেদা জিয়ার সাথে আলোচনার জন্য তারা দুইজন তাঁর তৎকালীন ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়েছিলেন। সাত দলের ব্যানারে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশজুড়ে খালেদা জিয়ার ব্যাপক পরিচিতি গড়ে উঠে। এরশাদের ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটের মধ্য দিয়ে তিনি ‘আপসহীন’ ‘দেশ নেত্রী’ উপাধি পান। এতে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এর পরেও দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনি।

সকল সংকট দেশে থেকেই মোকাবিলা করেছেন, বিদেশে যাননি
২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি কে এম হাসানের নিয়োগ নিয়ে সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই সেই দায়িত্ব নেন, যা তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত ও জটিলতা তৈরি করে। এরপর ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন নেমে আসে। তাঁর দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয় এবং খালেদা জিয়াকেও কারাবরণ করতে হয়। শত চাপের মুখেও তিনি বিদেশ যেতে রাজি হননি এবং বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশই আমার শেষ ঠিকানা।’ এমনকি তাকে তখন জোর করে সৌদি আরবের বিমানে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিষেধ করায় সৌদি সরকার তাকে ভিসা দিতে রাজি হয়নি।

দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বাধ্য হলেও খালেদা জিয়া দেশে থেকে যান এবং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হয়েছিল, তা ছিল বিএনপির প্রতি বৈরী। এর ফলে নির্বাচনে বিএনপির ভালো ফল করার কোনো সুযোগ ছিল না। এ রকম পরিস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরবর্তী ১৫ বছরে দেশে একধরনের স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হয়। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা গুম-খুনের শিকার হন, আয়নাঘর বানানো হয়। বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় এবং তাঁকে দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে বন্দী রাখা হয়। সেখানে তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লে পরে তাঁকে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পান। এটা ইতিবাচক বিষয় ছিল যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অপেক্ষায় থাকা একটি দেশে তিনি মুক্তভাবে ফিরতে পেরেছিলেন। ২১ নভেম্বর ২০২৫-এ সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁকে শেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা যায়। এর দুই দিন পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং অবশেষে গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন।

বেগম খালেদা জিয়া এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি নীতির প্রশ্নে বা দেশের স্বার্থে কখনোই আপস করেননি এবং কোনো বৈদেশিক শক্তির কাছে মাথা নত করেননি। দেশের রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে একজন অভিভাবক হিসেবে তাঁর ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। তাঁর এই প্রস্থান তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে।
শীর্ষনিউজ