টুডে রিপোর্ট
দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে দেশের বিভিন্ন আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে ভয়াবহ অসঙ্গতি ও দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সবার জন্য আইন সমান হলেও, বাস্তবে ৬৪ জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়ন বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে একেক প্রার্থীর জন্য একেক ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ করছেন—যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের একাধিক আসনে শুধু দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের কপি বা ইমেইল কনফার্মেশন জমা দিয়েই প্রার্থীরা বৈধ ঘোষিত হয়েছেন। অথচ অন্য কিছু আসনে একই ধরনের কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
যেসব আসনে আবেদনের কপি দিয়েই বৈধ ঘোষণা
তথ্য অনুযায়ী—
দিনাজপুর-৫ : ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান
(ইউকে হোম অফিসে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের প্রমাণ দেখিয়ে বৈধ)
সুনামগঞ্জ-৩ : ব্যারিস্টার আনোয়ারুজ্জামান
(দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের কপি জমা দিয়েই বৈধ)
ঢাকা-১ : ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম
(আবেদনের প্রমাণ দিয়েই বৈধ)
যশোর-২ : ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ
(দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের কপিতেই বৈধ)
ফেনী-৩ : আব্দুল আউয়াল মিন্টু
(মার্কিন দূতাবাসে পাঠানো ইমেইলের কপি দেখিয়েই বৈধ ঘোষণা)
ফরিদপুর-২ : সামা ওবায়েদ
(শুধু ইমেইল কনফার্মেশনেই মনোনয়ন বৈধ)
অন্যদিকে, কিছু আসনে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের পূর্ণাঙ্গ সনদ ছাড়া কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়নি।
এর জ্বলন্ত উদাহরণ কুড়িগ্রাম-৩ আসন।
গত ৪ জানুয়ারি, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহির মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত হলেও সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে না দেখেই তার মনোনয়ন বাতিল করা হয় এবং আবেদনের কপিকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়নি।
রাজনৈতিক মহল বলছে, একই আইনে এক নাগরিকের জন্য এক সিদ্ধান্ত, অন্য নাগরিকের জন্য আরেক সিদ্ধান্ত—এটি স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।
আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে—
ইউকে বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক (সিলেট-৩)
অনলাইনে নয়, কাগজে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করেছিলেন। নাগরিকত্ব বাতিলের চূড়ান্ত প্রমাণ দিতে না পারলেও তাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।
ইউকে বিএনপির সেক্রেটারি
দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে কি নেই—এ প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়েও বৈধ ঘোষিত হয়েছেন।
এমন ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে ভোটারদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই মনে করছেন, কোথাও নির্বাচন কমিশনের নাম ব্যবহার করে নিজেদের মতো করে আইন ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, আবার কোথাও উদারতা দেখানো হচ্ছে।
একজন সচেতন ভোটার বলেন,
“যদি শুধু আবেদন করলেই বৈধ হয়, তাহলে সবার ক্ষেত্রে তাই হতে হবে। আর যদি পূর্ণাঙ্গ সনদ লাগে, সেটাও সবার জন্য এক নিয়ম হওয়া উচিত।”
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বিচারিতা চলতে থাকলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে এটি আইনের শাসন ও সমান অধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা জানতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।