বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থেমে নেই অপপ্রচার। একের পর এক অপপ্রচার ছড়িয়েছে তাকে কেন্দ্র করে। তাকে নিয়ে একের পর এক অপপ্রচার শনাক্ত করেছে দেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।
২০২১ সালে সামাজিক মাধ্যমে একটি দাবি ছড়িয়ে পড়ে যে, জাইমা রহমান লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে বিশ্বে প্রথম হয়েছেন। তবে যাচাই করে দেখা যায়, এই দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। জাইমা রহমানের রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো পরীক্ষায় বিশ্বে প্রথম হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, জাইমা রহমানের নামে পরিচালিত একটি ভুয়া ফেসবুক পেজ থেকে এমন পোস্ট দেওয়া হলে সেটি ইন্টারনেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, জাইমা রহমানের ফেসবুক ও টুইটারে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। এরপরও একই গুজব পরবর্তী বছরগুলোতে বারবার ছড়াতে দেখা যায়।
সেসময় জাইমা রহমানের নিজস্ব কোনো পাবলিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রোফাইল না থাকার সুযোগ নেয় একটি মহল। তার নামে ফেসবুকে অসংখ্য ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যেগুলোর কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। এসব ভুয়া প্রোফাইলের পোস্টের ভিত্তিতে কিছু গণমাধ্যমও বিভ্রান্ত হয়।
২০২৩ সালের মার্চে জাইমা রহমানের নামে পরিচালিত একটি ভুয়া ফেসবুক পেজের পোস্টের সূত্র ধরে দৈনিক নয়া শতাব্দীতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জাইমা রহমান তার ফেসবুক পেজে শিগগির দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন। পরে একই পেজ থেকে আবারও দাবি করা হয়, ২০২৩ সালের জুন মাসে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন।
২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর জাইমা রহমানের একটি অফিশিয়াল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। একই সময়ে তার ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টও চালু করা হয়। তবে এরপরও ভুয়া পেজ ও অ্যাকাউন্টগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে ফেসবুকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় জাইমা রহমানের নাম অনুসন্ধান করলে এমন অসংখ্য সক্রিয় অ্যাকাউন্ট ও পেজের সন্ধান পাওয়া যায়।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে কন্যা জাইমা রহমানও দেশে আসেন। এর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের দেশে ফেরা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছিল। এই সময় জাইমা রহমানকে কেন্দ্র করে একাধিক ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যার একটি ছিল তাদের দেশে ফেরার প্রসঙ্গ নিয়ে
দেশে ফেরার পরও জাইমা রহমানকে ঘিরে গুজব ছড়াতে দেখা যায়। দেশে ফিরে প্রথম তিন দিনে তারেক রহমান বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল গণসংবর্ধনা, অসুস্থ খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া এবং জিয়াউর রহমান ও ওসমান হাদির কবর জিয়ারত। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তারেক রহমান ও জাইমা রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন এআই তৈরি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়।
এর মধ্যেই গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে জাইমা রহমান ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
এরপর গত ২ জানুয়ারি দাদি খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করার সময় জাইমা রহমানের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। পরে ওই ছবিকে কেন্দ্র করে খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমানের সঙ্গে শেখ হাসিনার নাতনি আমরিন খন্দকারের তুলনা করে সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য পোস্ট ছড়াতে দেখা যায়।
এই প্রচারণার মধ্যেই ২ জানুয়ারি থেকে পরদিন ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘Tin Tin’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে জাইমা রহমানকে জড়িয়ে অপতথ্য ছড়ানো হয়। তিনটি পোস্টে জাইমা রহমানের বিকিনি পরিহিত ছবি দাবিতে দুটি ছবি প্রচার করা হয়। অন্য একটি পোস্টে ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক ট্যাবলয়েড পত্রিকা মেট্রোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের দাবি করে একটি ছবি ছড়ানো হয়। কথিত ওই প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়, মদ্যপ অবস্থায় গভীর রাতে গাড়ি ধাওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ায় জাইমা রহমানের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়েছে।
মেট্রোর কথিত ওই প্রতিবেদন বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, পত্রিকাটির পক্ষ থেকে এমন কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি। জাইমা রহমান বাংলাদেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়ায় সে সময় এমন কোনো ঘটনা ঘটলে দেশের গণমাধ্যমেও তা প্রকাশ পেত, কিন্তু এমন কোনো প্রতিবেদন মেলেনি। মেট্রোর ওয়েবসাইটের আর্কাইভে অনুসন্ধান করেও ২০১৫ সালের ১৩ ও ১৪ এপ্রিলের কোনো সংস্করণ পাওয়া যায়নি। তবে ১২ ও ১৫ এপ্রিলের সংস্করণের সঙ্গে তুলনা করে ডিজাইনে একাধিক অসংগতি দেখা যায়। সাধারণত মেট্রোর লোগোর নিচে তারিখ থাকে, কিন্তু আলোচিত ছবিতে লোগোর ওপরে তারিখ দেখা যায়। এ ছাড়া লেআউট ও ফন্ট ব্যবহারে আরও কিছু অমিল রয়েছে। জেমিনি অ্যাপে গুগলের সিন্থআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবিটি যাচাই করলে জানানো হয়, ছবিটির অধিকাংশ বা পুরো অংশই গুগলের এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।
এ ছাড়া জাইমা রহমানের বিকিনি পরিহিত ছবি দাবিতে একই অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ছবি দুইবার পোস্ট (১, ২) করা হয়। ছবিটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেটি বাস্তব নয়। মূলত জাইমা রহমানের অন্য একটি ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সম্পাদনা করা হয়েছে। ছবিটির নিচে গ্রক এআইয়ের জলছাপ দেখা যায়। গ্রক হলো xAI-এর একটি এআই চ্যাটবট। এতে ২০২৫ সালের শেষের দিকে ইমেজ এডিটিং সুবিধা যুক্ত হয়। এরপর এই ফিচার ব্যবহার করে নারী ও শিশুদের আপত্তিকর ও অশালীন ছবি তৈরির একাধিক ঘটনা সামনে আসে। এ বিষয়ে ইলন মাস্ক জানান, যারা প্ল্যাটফর্মটির এআই সেবা ব্যবহার করে অবৈধ কনটেন্ট তৈরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ কনটেন্ট আপলোডের মতোই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অপর একটি বিকিনি পরিহিত ছবি দাবিতে প্রকাশিত ছবিটিও এআই দিয়ে তৈরি। ছবিটির সামগ্রিক উপাদানে এআইজনিত অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। ছবিটির নিচের ডান কোণে গ্রক এআইয়ের জলছাপ মুছে ফেলার চেষ্টার চিহ্নও দেখা যায়। একাধিক এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী ওয়েবসাইটে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
‘টিন টিন’ নামের অ্যাকাউন্টটির ‘অ্যাবাউট’ সেকশনে নিজেকে ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ড শহরের বাসিন্দা হিসেবে দাবি করা হয়েছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত আইনি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান লন্ডনিয়ান সলিসিটরসে সার্টিফায়েড প্যারালিগাল হিসেবে কর্মরত। তবে ফেসবুকের ট্রান্সপারেন্সি সেকশনের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি ওমান থেকে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি খোলা হয়েছে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এসব তথ্যের ভিত্তিতে অ্যাকাউন্টটি ভুয়া পরিচয় ও ভুয়া নামে পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। অতীতে রিউমর স্ক্যানার এই অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক গুজব ছড়ানোর নজির পেয়েছে। এর আগে ফারিয়া নামের এক তরুণীর বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক অপপ্রচার চালানো হয়েছিল এই আইডিটি থেকে।
রিউমর স্ক্যানারের প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাইমা রহমানকে ঘিরে প্রথম গুজব ছড়ানো হয় ২০২১ সালে। এ পর্যন্ত তাকে জড়িয়ে মোট ২১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা ২৪টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মিথ্যা তথ্য পুনঃপ্রচারের মাধ্যমে সাতবার ছড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ দিনেই তাকে নিয়ে তিনটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। পরিবারসহ দেশে ফেরা এবং পরবর্তী তিন দিনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পাঁচটি এআই-তৈরি ছবি ছড়িয়েছে।