Image description
ফ্যাসিস্ট হাসিনার পরামর্শদাতারা সক্রিয়

ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে নতুন মোড়কে মাঠে নেমেছে মাফিয়াতন্ত্রের নেত্রীর অলিগার্করা। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দিল্লির নীল নকশায় নানাপন্থায় সরকার উৎখাতের চেস্টা করে ব্যর্থ হয়ে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি আমদানি করে আগামী সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে। দিল্লির এজে-া অনুযায়ী জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনকে দিয়ে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে চাপ দেয়। সরকারের কয়েকজন উপদেস্টা এবং এনজিও থেকে গুগরুত্বপূর্ণ পদে আসা ব্যাক্তি পিআর পদ্ধতির নির্বাচন দাবিকে ইস্যু করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিএনপিসহ অর্ধশত দলের বিরোধিতা এবং প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ‘পিআর পদ্ধতির দাবি মাঠে মারা যায়। শুধু তাই নয় ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের কারণে দলটির ‘রাজনৈতিক মৃত্যু’ ঘটে। জুলাই অভ্যুত্থানে শত শত মানুষ হত্যা এবং গুম-খুনসহ মানবাধিকার লংঘনের কারণে দলটির প্রতি মানুষের ঘৃর্ণা। আবার দলটির ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনা করার চেষ্টা হলে জনপ্রতিরোধে পড়তে পারে। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষার অজুহাতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চর্চায় মুজিব কোর্ট ছুঁড়ে ফেলে ‘মঞ্চ ৭১’-এর আত্মপ্রকাশ করে। ১৫ বছর নানাভাবে বৈধ-অবৈধ ভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নিয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে যারা হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হতে উদ্বুদ্ধ করেন; তারাই মূলত ‘মঞ্চ ৭১’ গঠনের নেপথ্যের কারিগর। উদ্দেশ্য ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনগণের দুর্বলতা পুঁজি কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগকে বাঁচিয়ে রাখা।

রাজিৈনতক বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যাসিন্ট হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ইস্যুতে জুলাই চেতনা ধারণ করা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্যের বিকল্প নেই। বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত, ডান-বাম, মধ্যপন্থী দলগুলোর নিজেদের মধ্যে বিরোধ থাকবে; কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ভারত, ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। মাফিয়াতন্ত্রের আওয়ামী লীগ এবং গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটের অধিকার খর্বকারী হাসিনাকে কোনো ভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। তবে ’৪৭ এর দেশ ভাগ এবং ’৭১ এর চেতনার ধারাবাহিকতায় জুলাই ২০২৪ চেতনা চর্চা করতে হবে। ’৪৭ সালের দ্বিজাতি তত্ত্বে পাকিস্তানের জন্ম এবং ’৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ইতিহাস থেকে মুঁছে ফেলার চেস্টা করা যাবে না।

গতবছরের ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে ভারতে যাওয়ার পর থেকে দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্করা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নানামুখি ষড়যন্ত্র করে। জুডিশিয়াল ক্যু, সেনাবিদ্রোহ, ঢাকা অবরোধ, আনসার বাহিনী দিয়ে সচিবালয় ঘেড়াও, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ফেইক ইস্যু সৃষ্টি, গার্মেন্টসে বিশৃংখলা, পাহাড়ে অশান্তি সব ধরণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অতপর গোপালগঞ্জ কেন্দ্রিক কিছু বিশৃংখলা সৃষ্টির তৎপরতা চালিয়ে আওয়ামী লীগের অস্থিত্ব জানান দেয়ার চেস্টা করে। কিন্তু জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই কর্মসূচিতে হামলার পর আইন শৃংখলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযানে গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিপর্যয় ঘটে। অতপর হাসিনা অনুগত বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ আইনজীবীকে মাঠে নামানো হয়। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমান সরকারের নানা সমালোচনা করে ‘আগের সরকার ভাল ছিল’ ন্যারেটিভ তৈরি চেস্টা করে। এমনকি আওয়ামী লীগের পক্ষ্যে হাজার হাজার কন্টেইন ক্রিয়েটার, ইউটিউবারকে সোশ্যাল মিডিয়ায় নামানো হয়। পাশাপাশি ‘১৫ আগস্ট শোক দিবস’ পালনের চেস্টায় নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘মঞ্চ ৭১’ গঠন করে। গত ৫ আগস্ট আত্মপ্রকাশ করা ‘মঞ্চ ৭১’ এর আহবায়ক প্রফেসর আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ও সদস্য সচিব সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্নাকে করা হয়। তবে এ সংগঠনে নেপথ্যে ড, কামাল হোসেন, ইসলাম বিদ্বেষী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, প্রফেসর মেজবা কামাল, প্রফেসর শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন) সহ শত শত আওয়ামী সুবিধাভোগী রয়েছেন। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকীরা গত ১৫ আগষ্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে ফুল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিরোধের মুখে সেখানে যেতে পারেননি। তাদের হয়ে ৫/৬ জন এককভাবে সেখানে গেলে গণধোলাইয়ের কবলে পড়েন এবং পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার ইউনিটিতে (ডিআরইউ) মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘মঞ্চ ৭১’ আয়োজিত অনুষ্ঠান ঘিরে উত্তেজনার পর সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাও রয়েছেন।

জানা যায়, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ‘মঞ্চ ৭১’। অনুষ্ঠানের ব্যানারে প্রধান অতিথি হিসেবে গণফোরামের সাবেক সভাপতি ড. কামাল হোসেন লেখা হয়। কিন্তু ওই একই সময়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত আরেকটি অনুষ্ঠাতে ড. কামাল হোসেনের নাম দেখা যায়। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীকে নিয়ে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সেখানে হাজির হলে কানাঘুষা শুরু হয়।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন) বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে জামায়াত-শিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরাচ্ছে।’

প্রফেসর কার্জনের বক্তব্য শেষ না হতেই একদল ব্যক্তি সেøাগান দিতে দিতে ডিআরইউ মিলনায়তনে ঢোকেন। তারা ‘জুলাইয়ের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’, ‘জুলাইয়ে যোদ্ধারা এক হও লড়াই করো’ সেøাগান দিতে দিতে গোলটেবিল আলোচনার ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন। এ সময় তারা আলোচনায় অংশ নেওয়া চিহ্নিত ব্যক্তিদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ এলে তাঁদের কাছে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের তুলে দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকজন যুবক ‘জুলাই যোদ্ধা’ ব্যানারে অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে লতিফ সিদ্দিকী ও অন্যান্য উপস্থিত ব্যক্তিদের অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং মিলনায়তনে প্রবেশ ও অবস্থান ঠেকাতে চেষ্টা করেন।

‘জুলাই যোদ্ধা’ ব্যানারে থাকা আল আমিন রাসেল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে ষড়যন্ত্র করছে, যা আমরা হতে দিতে পারি না।’ উপস্থিত একজন বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে চব্বিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, একাত্তর আমাদের ভিত্তি এবং চব্বিশ আমাদের মুক্তি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখানে যারা জড়ো হয়েছেন, তারা সবাই চব্বিশের খুনের সঙ্গে জড়িত। আমরা আইন নিজের হাতে না নিয়ে তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করেছি।’পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীসহ ছয়জনকে প্রথমে শাহবাগ থাকানা অতপর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যায়।

জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর বলেন, লতিফ সিদ্দিকীসহ কয়েকজনের বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। এছাড়া আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। আইনগত দিকগুলো দেখা হচ্ছে। রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, মবের শিকার যেন না হন লতিফ সিদ্দিকী, তাই তাকে এবং তার কয়েকজন সহযোগীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি এখন পুলিশ হেফাজতে, এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

‘মঞ্চ ৭১’ ব্যানারে ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক ভন্ডুলের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনরা সবর হয়ে উঠেছেন। বেশির ভাগ নেটিজেনের মতে ‘মঞ্চ ৭১’ ব্যানারে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের চেস্টা হচ্ছে মন্তব্য করছেন। তাদের বক্তব্য ১৪০০ ছাত্রজনতার হত্যকারী আওয়ামী লীগকে কোনো ব্যানারে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়া হবে আত্মঘাতি। বিগত ১৫ বছরের জুলুম-নির্যাতনের কথা মাথায় রেখে জুলাইয়ের চেতনায় সকল শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক শক্তিকে একাট্ট থাকতে হবে।