
৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিকভাবেও তৎপরতা বাড়িয়েছে বিএনপি। নির্বাচন, সংস্কারসহ নানা বিষয়ে দলীয় অবস্থান কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে বিএনপি’র তরফে। একইসঙ্গে এসব বিষয়ে বিএনপি’র দলীয় অবস্থান জানতে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে বিএনপি’র সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনা করা হচ্ছে। দলীয় সূত্রের দাবি সার্বিক বিষয়ে যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোচ্ছে তা দেশের মানুষের পাশাপাশি বিশ্ববাসীকে জানাতে চায় বিএনপি। বিভিন্ন দেশ ও কূটনীতিক পক্ষ থেকে যোগাযোগের আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নেতারা।
দলীয় সূত্র জানায়, আগামীতে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিএনপি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে এবং করে যাচ্ছে বলে কূটনৈতিক বৈঠকগুলোতে জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বিএনপি রাষ্ট্র ও সরকার কাঠামোর সংস্কারে বদ্ধপরিকর বলেও জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে বলা হচ্ছে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে এই নীতি এবং অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।
লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কূটনৈতিক, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বৈঠক করছেন। সম্প্রতি লন্ডনে একটি অভিজাত হোটেলে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে দু’দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও বিএনপি’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রসঙ্গে জানতে চান রাষ্ট্রদূত। ওদিকে গত প্রায় এক বছরে বাংলাদেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে আমেরিকা, ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং সৌদি আরবসহ ১৫টি দেশের কূটনৈতিকরা বৈঠক করেছেন। পৃথক পৃথক এসব বৈঠকে জাতীয় নির্বাচন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সর্বশেষ ২১শে জুলাই বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভুটানের রাষ্ট্রদূত দাশো খারমা হামু দর্জি। গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসভবনে (ফিরোজা) এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান রাষ্ট্রদূত।
লন্ডনে বিএনপি’র সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৫ই আগস্টের পর থেকে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ব্যবসায়ীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিএনপি’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নির্বাচন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। বৈঠকের শুরুতে তারেক রহমান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত কুশল বিনিময় করেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের উন্নয়নে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত। এ ছাড়া বৈঠকে লন্ডনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায় বলেও সূত্রটি জানায়। এসব বৈঠকে তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি মানবজমিনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে তারেক রহমানের ভাবনা এবং পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতে দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নসহ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ওদিকে আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় চীন সফর করেছে বিএনপি’র বেশ কয়েকটি প্রতিনিধিদল। সমপ্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের চীন সফর করেছে। এই সফরের মধ্যদিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বিএনপি’র সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল। বিএনপি’র উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের এই সফর ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে গত প্রায় এক বছরে আমেরিকা, ভারতসহ ১৫টি দেশের কূটনৈতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি’র সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। এসব বৈঠকে নির্বাচন, নতুন সরকারের সঙ্গে কাজে আগ্রহ প্রকাশ এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সৌহার্দ্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করছে। বাংলাদেশের কূটনীতির যে মূলধারা, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল বিদায়ের পর বিএনপি প্রথম ডান-বাম নির্বিশেষে বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বিবেচনায় আগামীতেও আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাবো।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হতে যাচ্ছে, এজন্য সবার একটা স্বস্তি ও সন্তুষ্টি আছে। আশা রয়েছে, দ্রুত নির্বাচনের দিকে গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাবে দেশ। কারণ অনেক কিছু অপেক্ষা করছে একটা নির্বাচিত সরকারের ওপর, তাদের কর্মকাণ্ড, আগামী দিনে কী হবে। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি অনেক সিদ্ধান্ত আছে। যেগুলো একটি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সবাই স্বস্তিবোধ করে।