Image description

গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই যশোরের চাঁচড়া এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেওয়া ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল ঢুকে পড়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে। মিছিলকারীরা সোজা সমবেত হন চিত্রা সিনেমা মোড়ে। তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে সেখানে অবস্থিত হোটেল জাবিরের ওপর।

১৭ তলাবিশিষ্ট শহরের সবচেয়ে উঁচু এই ভবনটি পদ্মার দক্ষিণের ২১ জেলার একমাত্র পাঁচতারকা হোটেল। এর মালিক যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার।

৫ আগস্ট ব্যাপক ভাঙচুরের পর বিক্ষুব্ধ জনতা এক পর্যায়ে হোটেলটিতে আগুন দেন। কিন্তু নিচে যখন আগুন ধরানো হয়, ওপরের ফ্লোরগুলোতে তখন অবস্থান করছিলেন হোটেলের বোর্ডার (অতিথি), ঢুকে পড়া বহু কৌতূহলী মানুষ। মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। ভেতরে আটকেপড়া অনেকেই আর বের হতে পারেননি। শুধু হোটেলটির ছাদ থেকে হেলিকপ্টারযোগে একজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ে পাঠানো তথ্যমতে, সেদিন পুড়ে যাওয়া শতাধিক মানুষের মধ্যে ২২ জনের মৃত্যু হয়। যশোর কোতোয়ালি থানা কর্তৃপক্ষ ২৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছিল। পুড়ে ক্ষতবিক্ষত হোটেল জাবিরের ১৭ তলা ভবনটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল স্থানে। ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী কি না জানে না সরকারি কর্তৃপক্ষ।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যশোরের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, কর্তৃপক্ষ ভবনটি সিলগালা করে দিয়েছে।

যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ভবনটির কাচগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। রাস্তায় চলাচলরত মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ভবনটি নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

joshor-2

 

দুঃশাসনের আইকনিক টাওয়ার

হোটেল জাবিরকে দুঃশাসন আর নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে দেখেছে অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ। যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু বলেন, হোটেল জাবির ছিল দুঃশাসনের প্রতীক। পতনের আগের দিনও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলা করে। পরদিন মানুষের সব আক্রোশ গিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ সেক্রেটারির মালিকানাধীন হোটেল জাবিরের ওপর।

যশোর থেকে প্রকাশিত লোকসমাজের প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত বলেন, যশোরে আওয়ামী অপকর্মের আইকনিক টাওয়ার ছিল হোটেল জাবির। আওয়ামী লীগের নেতারাই বলতেন, ক্ষমতা না থাকলে এই স্থাপনা থাকবে না। সেটাই সত্য হয়েছে। জাবির ছাড়াও শেখ মুজিব, শেখ রাসেলের ম্যুরাল ও ভাস্কর্য ধ্বংস করে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

‘দখল করা’ জমিতে ভবন নির্মাণ

পদ্মার দক্ষিণের ২১ জেলায় একমাত্র পাঁচতারকা হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল। ২০১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এটি উদ্বোধন করেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে বহু বছর ধরে থাকা চিত্রা হলের নামে স্থানটির নামও হয়ে যায় ‘চিত্রা মোড়’। এটির সর্বশেষ মালিক ছিলেন আনোয়ারা বেগম নামে এক স্কুলশিক্ষিকা। সিনেমা হলের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আনোয়ারা গিয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সে সময়ে যশোরে প্রতাপশালী নেতা শাহীন চাকলাদারের কাছে।

অভিযোগ রয়েছে, চাকলাদার বিরোধ নিষ্পত্তি না করে উল্টো কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তিটি নামমাত্র টাকা দিয়ে নিজের নামে রেজিস্ট্রি ও দখল করে নেন। এরপর সেখানে ১৭ তলা ভবন তৈরির কাজে হাত দেন।

আরো যেসব কারণে আলোচিত জাবির

অভিযোগ রয়েছে, হোটেল জাবিরের সামনের অংশ পৌরসভার রাস্তার জায়গার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার অব্যাহতি পাওয়া মেয়র হায়দার গনি খান পলাশ বলেন, ভূমি দখল করে ভবনটি পৌরসভার জায়গার মধ্যে ঢুকে পড়েছে কি-না তা বলতে পারবেন তৎকালীন মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু। জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক মেয়র রেন্টু চাকলাদার আত্মগোপনে আছেন। ফোনেও তাকে পাওয়া যায়নি। ভবন নির্মাণের পর সেটি নিজের একমাত্র ছেলে জাবিরের নামে আবাসিক হোটেল হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নেন শাহীন চাকলাদার। অভিযোগ রয়েছে, শর্ত পূরণ না হলেও ক্ষমতার দাপটে তিনি এটিকে পাঁচতারকা হোটেলের স্বীকৃতি আদায় করেন।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রস্তুত করা রিপোর্টে বলা হয়, হোটেল জাবির তৈরি করতে প্রায় ১২০ কোটি টাকা খরচ হয়। সেখানে অবস্থিত বারে বৈধভাবে বিক্রি করা হলেও মদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া ছিল অবৈধ। নারীঘটিত কারবারের জন্য অল্পদিনেই হোটেলটি পরিচিত হয়ে ওঠে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের যশোর শহরের কেন্দ্রস্থলে চাকচিক্যময় হোটেল জাবির দ্রুতই নজর কাড়ে শহরবাসীর।

হোটেলটিতে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, ফিটিংস ছাড়াও ছিল দামি আসবাবপত্র। এর একটি আংশিক তালিকা পাওয়া যায় কোতোয়ালি থানায় রুজু হওয়া এজাহারে। ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়ে এজাহারে জানানো হয়, ১০০টি ফ্রিজ, ১০০টি স্মার্ট টেলিভিশন, ৪৫০ কিলোভোল্টের দুটি বৈদ্যুতিক জেনারেটর, এক হাজার কিলোভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, তিনটি লিফট লুট বা ধ্বংস হয়েছে। এজাহারে দাবি করা হয়, ঘটনার সময় হোটেলের ভল্টে থাকা নগদ ৯০ লাখ টাকাও লুট হয়ে যায়। তবে হোটেলটির বারে কী পরিমাণ মদ ছিল- এজাহারে তা উল্লেখ করা হয়নি।

কলকাতায় শাহীন চাকলাদার

চাকলাদারের বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে অফিসিয়াল কোনো তথ্য নেই। সদলবলে ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছেন বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে। অবশ্য চাকলাদারের স্ত্রী-সন্তান কোথায় আছেন, তা এখনো অজানা। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শাহীন চাকলাদার ও তার স্ত্রী ফারহানা জাহান মালা, দুই মেয়ে সামিয়া জাহান অন্তরা ও মাঈসা জাহান অহনা এবং ছেলে জাবির চাকলাদারের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত।

হাসিনার প্রশ্রয়ে বেপরোয়া শাহীন চাকলাদার

শাহীন চাকলাদার নানা কারণে দেশজুড়ে আলোচিত। হত্যা, সন্ত্রাসী বাহিনী লালন, জমি দখল, প্রতিপক্ষকে উচ্ছেদ, টেন্ডারবাজি, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগবাণিজ্য, পদবাণিজ্য, এমনকি ওসিকে থানায় বোমা নিক্ষেপের নির্দেশনা দেওয়ার মতো গর্হিত কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। এসব নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।

কোনো কোনো গণমাধ্যম তাকে ‘যশোরের গডফাদার’ হিসেবেও চিত্রিত করেছে। তার সব অপকর্মের তথ্য থাকা রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময় চাকলাদারের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরে প্রতিবেদনও পাঠিয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর ‘স্নেহধন্য’ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। উল্টো শেখ হাসিনা তাকে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে পদোন্নতি দিয়ে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্য বানান। মাত্র দুবছর সংসদ সদস্য থাকার পর তিনি কেশবপুরে কার্যত অচ্ছুত হয়ে পড়েন। পরের ‘ডামি’ নির্বাচনে তিনি কুখ্যাত হাতুড়ি বাহিনীপ্রধান ২৮ বছরের তরুণ আজিজুল ইসলামের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।