
তথ্য আহরণের জন্য মানুষকে একসময় ঘাটাঘাটি করতে হয়েছে বই। সময়ের বিবর্তনে তথ্য সূত্র হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে জার্নাল সমূহ।
তবে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে পাল্টে যেতে থাকে চিত্র। ধীরে ধীরে স্যাটেলাইট টেলিভিশন সমূহ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সেই টেলিভিশনও দাপট দেখাতে পারেনি বেশিদিন। অনলাইন গণমাধ্যম সমূহ বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে দ্রুত সংবাদ নিয়ে হাজির হয়। তাতে মানুষ পরদিন সংবাদপত্র পাঠ বা সময় করে টেলিভিশনের স্ক্রিনের জন্য আর বসার অপেক্ষা করতে হয়নি। বিশ্বব্যাপী বড় সংবাদপত্র বা টেলিভিশন সমূহ অনলাইন মাধ্যমে হাজির হন সংবাদ নিয়ে।
গল্পটা এখানেই শেষ নয়। গণমাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে ইন্টারনেট ভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক প্লাটফর্ম তৈরি হয়। একসময় ব্লগে লেখালেখি জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউবের মতো প্লাটফর্ম হাজির হলে তথ্যের অবাধ প্রবাহ আরও বেড়ে যায়। মূলধারার গণমাধ্যমকে পাশ কাটিয়েও স্যোসাল মিডিয়ায় বিভিন্ন তথ্য নিয়ে হাজির হতে থাকে। এমনকি গণমাধ্যমের জন্যও সেই সোর্স সমূহ সংবাদের খোরাক জোগায়। জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, তারকা এমনকি তারকারাও নিজেদের তথ্য সংবাদ মাধ্যমের পরিবর্তে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে থাকেন।
তথ্যের এই অবাধ প্রবাহের সুযোগে সংবাদ ভিত্তিক বিশ্লেষণ বা মতামত নিয়ে হাজির হতে থাকেন অনেকেই। অনলাইন মাধ্যমে তাদের লেখা বা ভিডিও কন্টেন্ট সমূহ বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। বাংলাদেশি দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থার কারণে যখন মূলধারার গণমাধ্যম সমূহ চাপে বা চাটুকারিতায় ব্যস্ত ছিল, তখন এসব অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা গণমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে মানুষের মনের খোরাক যোগাতে থাকেন। মানুষ তখন গণমাধ্যমের সংবাদের পরিবর্তে এসব অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ফলো করতে থাকে। তাদের কন্টেন্ট সমূহ ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রিজিমের বিরুদ্ধে তাদের অনলাইন কন্টেন্ট সমূহ জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমনকি জুলাই বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানে এসব অ্যাক্টিভিস্টের বিরাট ভূমিকা ছিল। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়েও রাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে এসব ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়নক হিসেবে হাজির হচ্ছেন। তেমনই জনপ্রিয় কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের নিয়ে আজকের এই আয়োজন।
পিনাকী ভট্টাচার্য: উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে জনপ্রিয় এই অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের জন্ম ১৯৬৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর। বগুড়া জেলা স্কুলের শিক্ষক শ্যামল ভট্টাচার্য’র ছেলে পিনাকী চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়লেও সেই পেশায় স্থায়ী হননি। বাম রাজনীতির মাধ্যমে তার ক্যারিয়ার শুরু হলেও ধীরে ধীরে তিনি লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ব্যক্তিজীবনে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের সহপাঠী আঞ্জুমান আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। রোসেফ আঞ্জুমান নামে তার একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।
উইকিপিডিয়া বলছে, এ পর্যন্ত তিনি ১৯টি বই লিখেছেন, পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও নিয়মিত কলাম লিখে আসছিলেন। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের পর তিনি গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের টার্গেটে পরিণত হন। তাকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর তার দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। তবে আত্মগোপনে থাকাবস্থায় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি দেশত্যাগ করতে সক্ষম হন। প্রথমে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গেলেও পরে ফ্রান্সে পাড়ি জমান পিনাকী ভট্টাচার্য। বর্তমানে সেখানেই তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। এই সময়ে তিনি রাজনৈতিক বিষয়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে নানাধরনের কন্টেন্ট নিয়ে হাজির হন। কন্টেন্ট সমূহ এতো জনপ্রিয়তা লাভ করে যে ফেসবুক-ইউটিউব মিলিয়ে তাকে অনুসরণ করা ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় অর্ধ কোটি দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার, ভারতের আধিপত্যবাদ, দেশের রাজনীতিতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের ভূমিকা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ নিয়ে হাজির হয়েছেন।
তবে সরকার পতনের পর তার বেশকিছু ভূমিকা বিতর্কের সৃষ্টি করে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি পিনাকীর ডাকে সাড়া দিয়েই ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি হিসেবে পরিচিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর গুঁড়িয়ে দেয় ছাত্রজনতা। পরবর্তীতে আরও কিছু স্থাপনার নাম ধরে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান পিনাকী। সবশেষ গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে (সিপিবি) ফ্যাসিবাদের সহযোগী আখ্যা দিয়ে পল্টনে অবস্থিত মুক্তি ভবন দখলের ডাক দেন তিনি। তবে তার সেই ডাকে সাড়া মেলেনি। এছাড়া সরকারের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, সরকারের একাধিক উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক দল বিএনপি সম্পর্কেও নানা বিতর্কিত বক্তব্য দেন। এসব বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম বিতর্ক তৈরি হয়।
ইলিয়াস হোসেন: সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে ইলিয়াস চ্যানেল ওয়ানে ‘গুড মর্নিং বাংলাদেশ’ ও একুশে টেলিভিশনে অপরাধ ভিত্তিক অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘একুশের চোখ’ এর উপস্থাপনা করেন। তবে একর্যায়ে প্রভাবশালীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে চাকরি হারিয়ে ২০১৫ সালের দিকে দেশ ছাড়েন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে থাকাকালে বাংলাদেশের রাজনীতিসহ অনলাইনে বিভিন্ন কন্টেন্ট তৈরি করেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমারের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন তিনি। যেখানে ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত নিয়ে সংস্থাটির প্রধান বনজ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপর তার নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করেন বনজ কুমার। মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের অন্যতম ছিলেন সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন। পিনাকী ভট্টাচার্য’র সঙ্গে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটিকে ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি অভিহিত করে তা গুঁড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনিও। এছাড়া সরকারের একজন উপদেষ্টাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র’ এর দালাল আখ্যা দিয়ে একাধিক ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করেন। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর ডালিমের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেও বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি।
জুলকারনাইন সায়ের খান সামি: শেখ হাসিনা সরকারের ভিত কাঁপানো অন্যতম প্রতিবেদন ছিল আল জাজিরার আলোচিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স ম্যান’। সচিত্র প্রতিবেদনটি সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের নানা অপকর্ম নিয়ে তৈরি। যারা তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদ ও সহায়তায় গড়ে তোলেন দুর্নীতি ও অপরাধের স্বর্গরাজ্য। শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপন চুক্তির মাধ্যমে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের বৈতরণী পাড়ি দিতে সহায়তা করে আজিজ আহমেদ।
আলোচিত সেই প্রতিবেদনের মাধ্যমে যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে, তিনি যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান সামি। মূলত প্রতিবেদনটি তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন তিনি। এরপর থেকে বাংলাদেশে অনলাইনে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. আব্দুল বাসেত খানের ছেলে জুলকারনাইন সায়ের খান, যিনি সামি হিসেবেই বেশি পরিচিত। তার জন্ম ১৯৮৪ সালে। সেনাকর্মকর্মকর্তার ছেলে হিসেবে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফ আই’তে সামির অনেক পরিচিত লোক ছিলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তিনি বিডিআর বিদ্রোহ, গুমসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেন। ছাত্রজনতার আন্দোলনে তিনি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়েও তথ্য প্রকাশ করেন। সবশেষ ৩ আগস্ট তিনিই আশ্বস্ত করেন যে, অভ্যন্তরীণ বৈঠকের সূত্র ধরে সেনাবাহিনী জনতার উপর গুলি চালাবে না। তার এসব বার্তা আন্দোলনে দুর্দান্ত প্রভাব ফেলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অ্যাক্টিভিস্ট যখন সেনাপ্রধান নিয়ে বিষেদগার করেন, তখন তিনি সেনাপ্রধানের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। অ্যাক্টিভিজমে থাকলেও শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সামনের দিকে আগানোর উপর জোর দিয়ে আসছেন।
ড. তাসনিম খলিল: ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিক হিসেবেই পরিচিত ড. তাসনিম খলিল। সুইডেন প্রবাসী এই সাংবাদিক অনলাইনে অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে তার কন্টেন্ট সমূহ নিজের পরিচালিত সংবাদ মাধ্যম নেত্র নিউজের মাধ্যমেই সামনে এসেছে বেশি। ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট আলোচিত আয়না ঘরের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে নেত্র নিউজ। যেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচক, অ্যাক্টিভিস্ট ও ধর্মীয় কারণে সরকারের রোষানলে পড়া ব্যক্তিদের গুম করে আলোচিত সেই আয়নাঘরে বছরের পর বছর রাখা হয়। কেউ সেখান থেকে ফিরে এসে মুখে কুলুপ আটেন, কাউকে পাওয়া যায় ভারতে, কারও লাশ মিললেও অনেকেরই জীবিত বা মৃত কোনোভাবেই মেলেনি অনুসন্ধান। নেত্র নিউজের সেই প্রতিবেদন থেকেই আয়নাঘর শব্দটি বহুল আলোচিত হয়। শেখ হাসিনার পতনের পর যুদ্ধাপরাধ মামলায় দণ্ডিত দুজন জামায়াত নেতার সন্তান আব্দুল্লাহিল আমান আযমী ও মীর আহমদ বিন কাসেম এবং ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা আলোচিত সেই ঘর থেকে মুক্তি পান।
ড. তাসনিম খলিলের জন্ম ১৯৮১ সালে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিএনএন এর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরামর্শক ছিলেন। এক-এগারো সরকারের সময় গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন তিনি। পরবর্তীতে দেশ ছেড়ে সুইডেনে আশ্রয় নেন। প্রবাসে থাকাকালে বাংলাদেশে মানবাধিকার, রাজনৈতিক নিপীড়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি সোচ্চার ছিলেন। সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ড. তাসনিম খলিল জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।